মানবপাচার চক্রের মূল হোতা মাদারীপুরের তাবিবুর রহমান ওরফে স্বপন মোল্লার নেতৃত্বে লিবিয়ার প্রধান মাফিয়া আশিক ওরফে ইমরান শেখ, বাংলাদেশি হাসান, বিষু মন্ডল, বাবু মোল্লা, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের সম্রাট শেখ ও কালু শেখের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে লিবিয়ায় নির্যাতনের ভিডিও করে পরিবার থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়ায় বাংলাদেশি নাগরিকদের আটক, নির্যাতন এবং পাচারকারীদের হাতে বন্দিত্বের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ১৮ আগস্টও লিবিয়ার গ্যানফুদা ডিটেনশন সেন্টারে আটক ১৭৪ বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। (BSS)
BMF News-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ এক অভিযোগের চিত্র। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দাবি, ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাসে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পথে লিবিয়ায় নেওয়ার পর কিছু বাংলাদেশিকে আটকে রাখা হয়। এরপর তাঁদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে সেই নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের কাছে পাঠানো এসব ভিডিও ও ফোনকলের মাধ্যমে স্বজনদের ভয় দেখিয়ে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো পরিবারের কাছ থেকে কয়েক দফায় লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগে উঠে এসেছে মাদারীপুরের তাবিবুর রহমান ওরফে স্বপন মোল্লার নাম। তাঁর নেতৃত্বে লিবিয়ায় একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে অভিযোগ।
এই অভিযোগে আরও যাদের নাম এসেছে তারা হলেন—লিবিয়ার আশিক ওরফে ইমরান শেখ, বাংলাদেশি হাসান, বিষু মন্ডল, বাবু মোল্লা, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের সম্রাট শেখ এবং কালু শেখ।
তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ স্বাধীনভাবে আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা হচ্ছে না। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, লিবিয়ায় আটকে থাকা ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে তা পরিবারের কাছে পাঠানো হয়। ভিডিওতে স্বজনদের কান্নাকাটি, মারধর কিংবা শারীরিক নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে দ্রুত টাকা পাঠানোর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ।
পরিবারগুলো অনেক সময় আতঙ্কের মধ্যে জমি-জমা বিক্রি, ধারদেনা কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দাবি করা অর্থ পাঠাতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্বজন।
লিবিয়া হয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথে বাংলাদেশিদের পাচার ও আটকে রাখার বিষয়টি যে বাস্তব ও গুরুতর সমস্যা, সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনেও তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। মে মাসে পূর্ব লিবিয়ার কর্তৃপক্ষ মানবপাচারকারীদের হাতে বন্দি ১২০ অভিবাসীকে উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল; একই সময়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও প্রকাশ্যে আসে।
অনুসন্ধানে এমন পরিবারের সন্ধান পাওয়ার দাবি করা হচ্ছে, যাদের স্বজনরা লিবিয়ায় যাওয়ার পর দীর্ঘদিন নিখোঁজ বা যোগাযোগের বাইরে রয়েছেন। The Daily Star-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে শারিয়তপুর ও মাদারীপুরের অন্তত ২৩ তরুণের নিখোঁজ থাকার কথা উঠে এসেছে; তাঁদের পরিবার জানে না তারা ডিটেনশন সেন্টারে, পাচারকারীদের আস্তানায় নাকি ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ হয়েছেন।
অন্যদিকে, জুলাই মাসেও ১৭১ বাংলাদেশি নাগরিককে লিবিয়া থেকে দেশে ফেরানো হয়। তাঁদের প্রত্যাবাসন বাংলাদেশ সরকার, লিবীয় কর্তৃপক্ষ ও IOM-এর সহযোগিতায় সম্পন্ন হয়।
BMF News-এর অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে খতিয়ে দেখা হচ্ছে—বাংলাদেশে কারা এসব যাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে, কীভাবে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর কারা তাঁদের গ্রহণ করে, কোথায় তাঁদের আটকে রাখা হয় এবং পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ কোন মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়।
এ ছাড়া ভুক্তভোগীদের পাঠানো ভিডিও, অডিও রেকর্ড, মোবাইল নম্বর, টাকা পাঠানোর রসিদ, বিকাশ/ব্যাংক লেনদেনের তথ্য, পাসপোর্ট ও ভ্রমণসংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
BMF News-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসছে—মানবপাচারের এই নেটওয়ার্ক কীভাবে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত, কারা এর সঙ্গে যুক্ত এবং কীভাবে নির্যাতন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।