ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আজই আমার শেষ দিন: নাছির

ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন

প্রকাশিতঃ দুপুর ১২:২৯, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩
ছবি: সংগৃহীত।

ছবি: সংগৃহীত।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেছেন, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজই আমার শেষ দিন। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি এ কথা জানান।

বিদায়ের এই সময়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার স্মৃতিচারণ করে নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ওয়ান ইলেভেনের দুঃসময়ে আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছরের সীমাহীন অনিশ্চয়তা, সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্যাতন, গুম ও খুনের ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে আমাদের পথ চলতে হয়েছে। এই সময়ে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হওয়া সব নেতাকর্মীকে গভীর কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

নাছির বলেন, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ, কঠিন, ঘটনাবহুল এবং একই সঙ্গে গৌরবের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। বিদায়ের মুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে অসংখ্য স্মৃতি সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, বেদনা এবং সবচেয়ে বেশি করে সহযোদ্ধাদের ভালোবাসা।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের সন্তান নাছির উদ্দীন নাছির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তখন একদিন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পাবেন, তা ভাবেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, রাজনীতি শুধু পদ-পদবির বিষয় নয়; এটি মানুষের জন্য কাজ করা, সংকটে পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকার দীর্ঘ যাত্রা।

নিজের রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করে নাছির বলেন, খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা, ত্যাগ এবং গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল অবস্থান তাদের প্রতিটি সংগ্রামের শক্তি হয়ে থেকেছে।

২০২৪ সালের ১ মার্চ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়েছে বলে উল্লেখ করে নাছির বলেন, আমাদের সময়ের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন। সে সময় নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, তাদের সাহস জোগানো এবং সংগঠনের প্রতিটি স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে ছিলেন বলে দাবি করেন নাছির। ঢাকার পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচ কলেজ এবং চার মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্বের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি তাদের প্রতি ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা জানান।

নাছির বলেন, আমাদের অনেকের নাম হয়তো ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে না। তবে একটি গণআন্দোলনের ইতিহাস শুধু কয়েকজন মানুষের নাম দিয়ে শেষ হয় না। এর পেছনে থাকে হাজারো পরিচয়হীন, নির্ভীক ও দুঃসাহসিক তরুণের ত্যাগ।

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, কাদের, মাহিন, রিফাত রশিদ ও হান্নান মাসুদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরে নাছির বলেন, আন্দোলনের সময়ে তারা ছাত্রদলকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ছাত্রদলের অবদান সবসময় সমানভাবে স্বীকার করতে পারেননি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে সংকটের সময়ে একসঙ্গে কাজ করার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান নাছির।

আন্দোলনের পরপরই নোয়াখালী-ফেনী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথাও স্মরণ করেন ছাত্রদলের এই নেতা বলেন, ওই এলাকার সন্তান হিসেবে বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে আমাকে নির্দেশ দেন বেগম খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে আমি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছ থেকেও ফেনীতে গিয়ে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা পাই।

নাছির বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদেশ এবং তারেক রহমানের নির্দেশনা পাওয়ার পর সেদিন রাতেই আমি ফেনীর উদ্দেশে রওনা হই। দু’দিন পর সভাপতি রাকিব ভাইসহ সুপার ফাইভের বাকি নেতারাও ফেনীসহ বৃহত্তর নোয়াখালী এলাকায় ছুটে যান।

এই অভিজ্ঞতা থেকে রাজনীতির সংজ্ঞা সম্পর্কে নিজের উপলব্ধির কথা তুলে ধরে নাছির বলেন, রাজনীতি শুধু মিছিল-মিটিংয়ের বিষয় নয়; মানুষের দুর্দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোই রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিচয়।

বেগম খালেদা জিয়ার ওই নির্দেশকে নিজের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে নাছির বলেন, সেটি শুধু একজন নেত্রীর নির্দেশ ছিল না; অসহায় ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বানও ছিল। শারীরিকভাবে খালেদা জিয়া তাদের সঙ্গে না থাকলেও তার নির্দেশ, মমতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা তাদের পথ দেখিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

দায়িত্ব পালনকালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘মব সংস্কৃতি’কেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন জানিয়ে নাছির বলেন, নানা ধরনের প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ছাত্রদলকে রাজপথে সক্রিয় রাখা সহজ ছিল না। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নিশ্চিত করাও ছিল নিয়মিত চ্যালেঞ্জ।

নিজেদের সময়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ দিতে গিয়ে নাছির বলেন, আমাদের দায়িত্ব পালনের সময়ে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছে। তবে এটিকে কোনো ব্যক্তির কৃতিত্ব হিসেবে দেখছি না। এটি ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত পরিশ্রমের ফল।

তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কিছু অপূর্ণতা থেকে গেছে বলেও স্বীকার করেন নাছির। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অল্প কয়েকটি কমিটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ সম্পন্ন করতে না পারার আক্ষেপ তার থাকবে বলে জানান তিনি। এ অপূর্ণতার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন নাছির।

কমিটিতে পদ না পাওয়া নেতাকর্মীদের প্রতিও নিজের অবস্থান তুলে ধরে নাছির বলেন, যারা কমিটির মাধ্যমে দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের অনেকেই যোগ্য ছিলেন এবং তাদের যোগ্যতার স্বীকৃতিই তারা পেয়েছেন। তবে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যারা সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হতে পারেননি, তাদের প্রতিও তার সমবেদনা ও শ্রদ্ধা রয়েছে।

একটি পদকে কারও যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়ে নাছির বলেন, যারা কোনো একটি কমিটিতে দায়িত্ব পাননি, তাদের অনেকেই আগামী দিনের নেতৃত্বে আরও বড় ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

ছাত্রসংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়াকেও নিজের দায়িত্বকালের একটি আক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে নাছির বলেন, একজন সংগঠক হিসেবে এই ফলাফল আমাকে প্রায়ই ভাবিয়েছে। কোথায় ঘাটতি ছিল এবং কোথায় আরও ভালো করা যেত, তা নিয়ে আমি নিজের কাছে প্রশ্ন করেছি। রাজনীতিতে পরাজয়ও শিক্ষা দেয়। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ছাত্রদল ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য ও সংগঠিত ছাত্রসংগঠন হয়ে উঠবে বলে আশা করেন তিনি।

দায়িত্ব পালনের সময়ে পাশে থাকা বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান নাছির। তিনি প্রথমেই বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এরপর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রুহুল কবির রিজভী, বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক আলহাজ্ব রকিবুল বকুলসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের সব জ্যেষ্ঠ নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা, জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের নেতা এবং সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান নাছির। বিশেষ করে কোনো পদ-পদবির প্রত্যাশা ছাড়াই যারা সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন, তাদের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেন তিনি।

নিজের দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাছির বলেন, আমরা হয়তো সবকিছু নিখুঁতভাবে করতে পারেননি। ভুল হয়েছে, সীমাবদ্ধতা ছিল এবং কখনো কখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ঘাটতি ছিল। তবে ছাত্রদলের স্বার্থের বাইরে গিয়ে কাজ করার ইচ্ছা তার কখনো ছিল না, এ বিষয়ে তিনি নিজের কাছে পরিষ্কার।

দায়িত্ব থেকে বিদায় নিলেও ছাত্রদল থেকে বিদায় নিচ্ছেন না বলে স্পষ্ট করে নাছির বলেন, পদ থেকে বিদায় নেয়া যায়, কিন্তু আদর্শ, ভালোবাসা ও সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়া যায় না।

আগামী দিনে ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্ব আসবে উল্লেখ করে তাদের প্রতি আস্থার কথাও জানান তিনি। তার বিশ্বাস, নতুন নেতৃত্বের অধীনে ছাত্রদল আরও শক্তিশালী, সংগঠিত ও গতিশীল হবে। নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন হলে তাদের ডাকে আগের মতোই পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন নাছির।


নিজের রাজনৈতিক জীবনে ছাত্রদলের দেয়া পরিচয়কে কোনো পদ দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সংগঠনের পতাকার নিচে পাওয়া মানুষ, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসাকেই নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন নাছির।

দায়িত্ব পালনের সময়ে কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে, কোনো সিদ্ধান্তে অন্যায় হয়ে থাকলে কিংবা কারও প্রাপ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হলে সহযোদ্ধাদের কাছে ক্ষমা চান তিনি।

নিজের রাজনৈতিক জীবনের অনিশ্চয়তা, ব্যস্ততা, অনুপস্থিতি ও কঠিন সময়গুলো নীরবে সহ্য করা পরিবারের সদস্যদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান নাছির। একই সঙ্গে বন্ধু এবং সাংবাদিকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। সাংবাদিকেরা তাদের কার্যক্রম মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন এবং কখনো প্রশংসা, কখনো সমালোচনা করেছেন উভয়কেই প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সবশেষে নাছির বলেন, আমি একটি দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি, তবে সম্পর্ক, সংগ্রাম ও আদর্শ থেকে নয়। ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে, অন্য কোনো দায়িত্বে বা অন্য কোনো সময়ে দেখা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তার প্রত্যাশা, নিজেদের শক্তি, নেতাকর্মীদের ভালোবাসা এবং আদর্শের ভিত্তিতে ছাত্রদল সামনে এগিয়ে যাবে। পরবর্তী নেতৃত্বের হাত ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আরও শক্তিশালী হবে এমন আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হোক এমন প্রত্যাশা জানিয়ে নাছির বলেন, জীবনের কোনো এক প্রান্তে গিয়ে তিনি সুখময়, সমৃদ্ধ ও সফল বাংলাদেশ দেখতে চান। সেই স্বপ্ন তিনি নিরন্তর দেখেন। তার পরিচয়-প্রতীক ছাত্রদল সেই বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে অবিচল থাকুক এমন প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে নিজের বিদায়ী বক্তব্য শেষ করেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।

Share This Article

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়