পরিবেশবান্ধব নির্মাণে দৃষ্টান্ত মাদারগঞ্জ জামে মসজিদ।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি: || বিএমএফ টেলিভিশন
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতির স্বাভাবিক আচরণ। তীব্র তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ঋতুচক্রের পরিবর্তন দেশের উত্তরাঞ্চলেও ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় পরিবেশের ওপর চাপ কমিয়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে। সেই ভাবনা থেকেই ঠাকুরগাঁওয়ে পরিবেশবান্ধব নির্মাণের একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছে ইকো-সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মাদারগঞ্জ গ্রামে ইএসডিওর নিজস্ব অর্থায়নে ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ১,৯০০ বর্গফুট আয়তনের মাদারগঞ্জ জামে মসজিদ। মসজিদটির নির্মাণকাজে প্রচলিত পোড়া ইটের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব হলো ব্লক। পুরো স্থাপনাটিতে ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ২,৬০০টি হলো ব্লক।
আকারের হিসাবে একটি হলো ব্লক প্রায় চারটি প্রচলিত পোড়া ইটের সমপরিমাণ। সে হিসাবে মসজিদটিতে ব্যবহৃত ২,৬০০টি হলো ব্লক প্রায় ১০,৪০০টি পোড়া ইটের সমপরিমাণ নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
বর্তমানে মসজিদটিতে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন শতাধিক ধর্মপ্রাণ মুসল্লি। ফলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি মসজিদটি হয়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব নির্মাণপ্রযুক্তির একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
পরিবেশ ও জলবায়ুর পরিবর্তিত বাস্তবতায় নির্মাণ খাতে পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে নতুন কোনো নির্মাণসামগ্রীর গ্রহণযোগ্যতা তৈরির জন্য এর বাস্তব ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।
ইএসডিও তাই পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার সম্পর্কে মানুষকে শুধু সচেতন করার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখেনি। বাস্তব স্থাপনায় এর ব্যবহার দেখানোর উদ্যোগও নিয়েছে। মাদারগঞ্জ জামে মসজিদ তারই একটি উদাহরণ।
১,৯০০ বর্গফুটের একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় স্থাপনায় পরিবেশবান্ধব হলো ব্লকের ব্যবহার স্থানীয় মানুষকে বিকল্প নির্মাণসামগ্রীর কার্যকারিতা সরাসরি দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রতিদিন মসজিদে আসা মুসল্লিদের পাশাপাশি আশপাশের মানুষও এই নির্মাণপদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন।
‘ইএসডিও আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও বড় উপহার দিয়েছে’
মসজিদটি নির্মাণ করে দেওয়ায় ইএসডিওর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব মো. আশরাফ আলী।
তিনি বলেন, “একটি সুন্দর ও স্থায়ী মসজিদ ছিল আমাদের এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। ইএসডিও সেই প্রত্যাশা পূরণ করে দিয়েছে। আজ শতাধিক মুসল্লি এখানে সুন্দর পরিবেশে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারছেন—এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা বিশেষভাবে আনন্দিত যে মসজিদটি পরিবেশবান্ধব হলো ব্লক দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আমাদের ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি এলাকার মানুষ নতুন ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণপ্রযুক্তি সম্পর্কেও জানতে পারছেন। এমন মহতী উদ্যোগের জন্য মাদারগঞ্জবাসী ও মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে ইএসডিওর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।”
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মো. রায়হানুল ইসলাম বলেন, “১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে আমাদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ মসজিদ নির্মাণ করে দেওয়া সত্যিই বড় একটি সহযোগিতা। এলাকার মানুষের একার পক্ষে এত বড় কাজ বাস্তবায়ন করা কঠিন ছিল। ইএসডিও পাশে দাঁড়ানোয় আজ আমরা একটি সুন্দর মসজিদ পেয়েছি।”
তিনি বলেন, “সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে, মসজিদটি এমন নির্মাণসামগ্রী দিয়ে তৈরি হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব। আমরা মনে করি, এই মসজিদ দেখে এলাকার অন্য মানুষও বাড়িঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে পরিবেশবান্ধব ব্লক ব্যবহারে আগ্রহী হবেন। ইএসডিওর প্রতি আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।”
মাদারগঞ্জ জামে মসজিদ নির্মাণে ইএসডিও নিজস্ব অর্থায়নে ব্যয় করেছে ১৬ লাখ টাকা। তবে এই বিনিয়োগের উদ্দেশ্য শুধু একটি ধর্মীয় অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জনকল্যাণের সঙ্গে পরিবেশ সচেতনতা এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণপ্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগকে যুক্ত করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
মসজিদের মতো নিয়মিত জনসমাগম হয় এমন একটি স্থাপনায় হলো ব্লক ব্যবহার করায় প্রতিদিনই মানুষ প্রযুক্তিটির বাস্তব প্রয়োগ দেখতে পাচ্ছেন। ফলে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর প্রতি মানুষের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতেও মসজিদটি ভূমিকা রাখছে।
ইএসডিওর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; আমরা প্রতিনিয়ত এর প্রভাব অনুভব করছি। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবেশের কথা ভাবতে হবে। উন্নয়ন এমন হতে হবে, যা মানুষের প্রয়োজন পূরণ করবে এবং একই সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতিও দায়িত্বশীল থাকবে।”
তিনি বলেন, “আমরা চাই পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী শুধু আলোচনা, প্রশিক্ষণ কিংবা প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকুক। মানুষ এর বাস্তব ব্যবহার দেখুক এবং উপলব্ধি করুক যে প্রচলিত পোড়া ইটের কার্যকর বিকল্প ব্যবহার করেও সুন্দর ও কার্যকর স্থাপনা নির্মাণ করা সম্ভব। মাদারগঞ্জ জামে মসজিদ সেই চিন্তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।”
ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান আরও বলেন, “একটি মসজিদ মানুষের ধর্মীয় জীবনের পাশাপাশি সামাজিক বন্ধনেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই এই স্থাপনাকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে আমরা একটি বার্তা দিতে চেয়েছি—মানুষের কল্যাণ, উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা একসঙ্গেই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।”
তিনি বলেন, “আমাদের আজকের উন্নয়ন যেন আগামী প্রজন্মের জন্য পরিবেশগত বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। বরং আজকের প্রতিটি ভালো উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার ভিত্তি হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
মসজিদটির পরিবেশবান্ধব নির্মাণের পরিসংখ্যানও উল্লেখযোগ্য। ১,৯০০ বর্গফুট আয়তনের মসজিদটি নির্মাণে ব্যবহার হয়েছে প্রায় ২,৬০০টি হলো ব্লক। একটি হলো ব্লক আকারে চারটি প্রচলিত পোড়া ইটের সমপরিমাণ হওয়ায় ব্যবহৃত ব্লকগুলো প্রায় ১০,৪০০টি পোড়া ইটের সমপরিমাণ নির্মাণকাজের প্রতিনিধিত্ব করে।
এটি স্থানীয় মানুষের সামনে বড় পরিসরের স্থাপনায় পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছে।
প্রতিদিন আজানের ধ্বনিতে মাদারগঞ্জ জামে মসজিদে সমবেত হন শতাধিক মুসল্লি। তাঁরা এখানে নামাজ আদায় করেন, সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করেন। একই সঙ্গে তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে পরিবেশবান্ধব নির্মাণের একটি বাস্তব উদাহরণ।
স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণে ইএসডিওর ১৬ লাখ টাকার এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি মসজিদ নির্মাণের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবেশ সচেতনতা, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার বার্তা।
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বড় উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে এমন বাস্তব পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। মাদারগঞ্জ জামে মসজিদ যেন সেই বার্তাই দিচ্ছে—ইবাদতের ঘরও হয়ে উঠতে পারে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অনুপ্রেরণা।