সারা দেশে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোট শুরু
আবুল হাশেম, রাজশাহী বিভাগীয়, প্রতিনিধিঃ || বিএমএফ টেলিভিশন
সারা দেশে একযোগে শুরু হয়েছে বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোট। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়, যা বিরতিহীনভাবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলবে। তবে জামায়াতে ইসলামীর এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে এটি প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এবার সংসদ সদস্য নির্বাচনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার ও প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’-এর পক্ষে বা বিপক্ষে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিটি ভোটারকে দুটি ব্যালট পেপার দেওয়া হচ্ছে—সাদা ব্যালটে সংসদ সদস্য নির্বাচন এবং গোলাপি ব্যালটে গণভোটে ‘হ্যাঁ/না’ ভোট।
এবারের নির্বাচনে মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সারা দেশে প্রস্তুত করা হয়েছে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র। নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। মোট প্রার্থী সংখ্যা ২ হাজার ২৮ জন; এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন।
দুটো নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে এবার দেশজুড়ে প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটগ্রহণের সার্বিক সমন্বয়ে জেলা ও নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব পালন করছেন ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং ৫৯৮ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা। মাঠপর্যায়ে সরাসরি ভোটগ্রহণের জন্য ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে নিয়োজিত থাকছেন ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিসাইডিং অফিসার। তাদের সহায়তায় ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং অফিসার।
গণঅভ্যূত্থানের পর এবারের জাতীয় নির্বাচনে আগের তুলনায় বেড়েছে ভোটার সংখ্যা। তাই ভোট ও ভোটারের নিরাপত্তায় এবার বাড়তি আয়োজন রাখা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে। ঝুঁকিপূর্ন কেন্দ্রের কারচুপি এড়াতে সার্বক্ষনিক নজরদারীতে থাকছে বডিওর্ন ক্যামেরা যুক্ত ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য। মাথার উপর নজরদারী করবে ৫শতর বেশি ড্রোন।
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নির্বাচনী অপরাধের তাৎক্ষণিক বিচার নিশ্চিতে মোট ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২৯৯টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী অপরাধ আমলে নেয়া ও সংক্ষিপ্ত বিচার সম্পন্ন করতে ৬৫৭ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট পাঁচ দিন মাঠে থাকবেন।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, ভোটগ্রহণের নিরাপত্তায় মোট ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৩ হাজার সেনা সদস্যের পাশাপাশি ৫টি জেলার ১৭টি আসনে ৫ হাজার নৌ-সদস্য এবং ৩ হাজার ৫০০ জন বিমানবাহিনীর সদস্য নিয়োজিত আছেন। এ ছাড়া ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ, ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন বিজিবি এবং ৯ হাজার ৩৪৯ জন র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তার কাজে আরও যুক্ত আছেন ৩ হাজার ৫৮৫ জন কোস্টগার্ড, বিএনসিসির ১ হাজার ৯২২ সদস্য এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ১৩ হাজার ৩৯০ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মী।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত ভোটাররা ভোট দিতে পারছেন। মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত হয়েছেন। আধুনিক ই-কেওয়াইসি ও ফেসিয়াল ভেরিফিকেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে জালিয়াতি প্রতিরোধ করা হয়েছে।
২০ দিনের প্রচারণা শেষে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সব ধরনের জনসভা ও মিছিল বন্ধ হয়েছে। এবারের নির্বাচনে রঙিন পোস্টার ও দেয়াল লিখন নিষিদ্ধ থাকায় সাদা-কালো পোস্টারে ছেয়ে যায় বিভিন্ন এলাকা।
নির্বাচন উপলক্ষে বুধবার রাত ১২টা থেকে আজ রাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সি ক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। মোটরসাইকেল চলাচলেও ১০ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৮১টি দেশি সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ৩৯৪ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও ১৯৭ জন বিদেশি সাংবাদিক উপস্থিত রয়েছেন। আনফ্রেল, কমনওয়েলথ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আইআরআই ও এনডিআইসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এখন সবার দৃষ্টি ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের দিকে।