ধর্ষককে ছিনিয়ে নিতে বাকলিয়ায় শত শত উত্তেজিত জনতা, অবরুদ্ধ পুলিশ!
রাজু চৌধুরী : || বিএমএফ টেলিভিশন
চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকায় সাড়ে তিন বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। শুক্রবার (২২ মে) বাকলিয়া থানার এক কর্মকর্তা জানান, ভুক্তভোগী শিশুর পিতা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অভিযুক্ত মনিরকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠায় এবং অভিযুক্ত মনিরকে আটক করে থানায় নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে এ সময় বিপুল সংখ্যক স্থানীয় জনতা তাকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে।
ওই শিশুকে ধর্ষণের অভিযুক্ত
ধর্ষককে’ তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে উত্তেজিত জনতা।
এনিয়ে বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঘটেছে তুলকালাম কাণ্ড। এলাকার শত-শত মানুষ ছয় ঘণ্টারও বেশিসময় ধরে সড়কে অবস্থান নিয়ে করেছে বিক্ষোভ। ‘
পুলিশের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতার দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি ছুঁড়লে পুরো এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে।
রাত ১০টা পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। পুলিশও আসামি নিয়ে থানায় যেতে পারেনি। তবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে পাঠানো হয়েছে ভুক্তভোগী শিশুকে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরীর বাকলিয়া থানার চরচাক্তাই নুর চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকার বাসিন্দা শিশুটিকে ধর্ষণের অভিযোগে মনির নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে এলাকাবাসী। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে ওই ব্যক্তিকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। তাকে নিয়ে থানার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগেই মানুষেরা রাস্তায় নেমে অবরুদ্ধ করে ফেলে পুরো এলাকা।
ঘটনাস্থলে থাকা বাকলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কিশোর মজুমদার বলেন, ধর্ষণের অভিযোগে একজনকে এলাকাবাসী আটক করেছে শুনেই এসেছিলাম। এরপরই তো উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
হঠাৎ করে কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় জড়ো হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়ে আমরা থানায় যাচ্ছিলাম। আমাদের গাড়ি আটকে দিয়েছে। পরে আমরা তাকে এলাকায় একটি ভবনের ভেতরে নিরাপদ স্থানে নিয়ে রেখে আমরা ভবনের গেইটের সামনে অবস্থান ছিলাম।’
পুলিশের জানায়, আটক হওয়া ব্যক্তির নাম মনির, বয়স প্রায় ৪০ বছর। চরচাক্তাই এলাকায় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজের কর্মচারী তিনি।
আক্রান্ত শিশুটির স্বজনদের ভাষ্য, দুপুরে শিশুটিকে ফুসলিয়ে মনির বাসার পাশের একটি ডেকোরেশনের দোকানে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ধর্ষণ করেন তিনি। পরে শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে ফিরে তার নানাকে ঘটনা জানায়। নানাসহ আরও কয়েকজন ডেকোরেশনের দোকানে গিয়ে মনিরকে আটক করেন।
এদিকে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, আটক মনির বলছেন, ‘আমি স্বীকার করছি আমি কাজটা করেছি। আমাকে শয়তানে পেয়েছিল।’
বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে আটক মনিরকে থানায় নেওয়ার সময় গাড়ি আটকে দিয়ে এলাকার নারী-পুরুষ, কিশোর-তরুণসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষেরা রাস্তায় এসে বিক্ষোভ শুরু করেন।
বিকেল থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা রাত পর্যন্ত চলতে থাকে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া শুরু হয় এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে পুলিশ, সাংবাদিক ও স্থানীয়রা আহত হন বলে জানা যায়। এ সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
আক্রান্ত শিশুর স্বজন এক নারী বলেন, ‘এইদেশে কোনো বিচার নাই। ছোট ছোট মেয়েদের ধর্ষণ করছে। আমার নাতনিকে ধর্ষণ করছে। আমি ফাঁসি চাই। আমি নিজে তারে ফাঁসি দিতে চাই।’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠে। আশপাশের এলাকা থেকেও লোকজন ঘটনাস্থলে জড়ো হয়। পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষসহ অন্তত ২০ জন আহতের খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিন পত্রিকার সাংবাদিক মামুন আবদুল্লাহ ও নোবেল হাসানকে ভর্তি করা হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোলাইমান জানান, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে এবং শিশুটিকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপ-পরিদর্শক সোহেল রানা জানান, শিশুটির অবস্থা এখন আগের চেয়ে ভালো এবং সে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ ঘটনায় পুরো এলাকা কিছু সময়ের জন্য অচল হয়ে পড়ে এবং পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়।