সুদিন ফিরবে কি তাঁত শিল্পের? খেলাপি ঋণের চাপে তাঁতবোর্ড।

বুলবুল হাসান, পাবনা জেলা প্রতিনিধি : || বিএমএফ টেলিভিশন

প্রকাশিতঃ বিকাল ০৪:৩২, রবিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ২০ পৌষ ১৪৩২
ছবি: বিএমএফ টেলিভিশন।

ছবি: বিএমএফ টেলিভিশন।

ক্রমাগত লোকসানে পাবনার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । ব্যবসায় মন্দাভাব, দফায় দফায় রঙ সুতার দামের বৃদ্ধি, উৎপাদিত কাপড়ের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায়, অস্তিত্ব সংকটে নিঃস্ব হয়েছেন অনেক তাঁত মালিকরা। পাবনা জেলায় লক্ষাধিক মানুষ এ শিল্পের উপর নির্ভরশীল হলেও লোকসানের কারণে, বেঁচে থাকার তাগিদে, অনেকেই ছেড়েছেন দীর্ঘ দিনের পারিবারিক পেশা। এই চিত্র বেড়া, সাঁথিয়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া,ও ফরিদপুর উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলের।  অনেকে আবার  তাঁত বন্ধ রেখে দিনমজুরি সহ ঢাকায় গার্মেন্টস শ্রমিক হিসাবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। জেলা জুড়ে বর্তমানে কাপড়ের হাটগুলো জনশূন্য হয়ে পরেছে ফলে জৌলুসতা হারিয়েছে জেলার ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের হাটেও। গেল ১০ বছরে জেলায় দুই-তৃতীয়াংশ তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এই শিল্প কে বাঁচাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী কে সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সহ বিনা সুদে ঋণ বিতরণের দাবী জানিয়েছেন তাঁত মালিকরা। ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী পাবনার তাঁত শিল্পের হারনো অতীত ফিরে আসুক এমনই প্রত্যাশা তাঁত শ্রমিকদের।

ক্রমাগত লোকসানে পাবনার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । ব্যবসায় মন্দাভাব, দফায় দফায় রঙ সুতার দামের বৃদ্ধি, উৎপাদিত কাপড়ের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায়, অস্তিত্ব সংকটে নিঃস্ব হয়েছেন অনেক তাঁত মালিকরা। পাবনা জেলায় লক্ষাধিক মানুষ এ শিল্পের উপর নির্ভরশীল হলেও লোকসানের কারণে, বেঁচে থাকার তাগিদে, অনেকেই ছেড়েছেন দীর্ঘ দিনের পারিবারিক পেশা। এই চিত্র বেড়া, সাঁথিয়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া,ও ফরিদপুর উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলের।  অনেকে আবার  তাঁত বন্ধ রেখে দিনমজুরি সহ ঢাকায় গার্মেন্টস শ্রমিক হিসাবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। জেলা জুড়ে বর্তমানে কাপড়ের হাটগুলো জনশূন্য হয়ে পরেছে ফলে জৌলুসতা হারিয়েছে জেলার ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের হাটেও। গেল ১০ বছরে জেলায় দুই-তৃতীয়াংশ তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এই শিল্প কে বাঁচাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী কে সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সহ বিনা সুদে ঋণ বিতরণের দাবী জানিয়েছেন তাঁত মালিকরা। ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী পাবনার তাঁত শিল্পের হারনো অতীত ফিরে আসুক এমনই প্রত্যাশা তাঁত শ্রমিকদের।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সাঁথিয়া বেসিক সেন্টার
(পাবনা)  সুত্রে জানা যায়, পাবনার বেড়া,সাঁথিয়া ও সুজানগর এলাকায় তাঁতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০০৩ সালের তাঁত বোর্ডের জরিপ অনুযায়ী হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা ৫৫ হাজার ও বিদ্যুৎ চালিত পাওয়ারলুমের সংখ্যা ২২ হাজার। এই তাঁতশিল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত প্রায় দেড় থেকে দুই লক্ষ নারী -পুরুষ। এছাড়াও অন্যান্য ব্যবসা ও পেশার প্রায় ২০ হাজারের অধিক মানুষ এই তাঁতশিল্পের সাথে জড়িত। এই তাঁতশিল্প কে কেন্দ্র করে প্বার্শবর্তী সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর ও পাবনা জেলার আতাইকুলা বৃহত্তর কাপড়ের হাঁট গড়ে উঠেছে যা এই এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে। তবে কয়েক বছরের ধারাবাহিক লোকসানে অর্থনৈতিক বিপ্লবের অন্যতম খাত পাবনার তাঁত শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সাঁথিয়া বেসিক সেন্টারের (পাবনা) তথ্যানুযায়ী, ১৯৯৯ সালের ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির আওতায় ১৭৮১ জন প্রান্তিক তাঁতীদের মাঝে ৩ কোটি ৫০ লক্ষ ৪৬ হাজার টাকা ঋন দেওয়া হয় যার মধ্যে ৭৬৯ জন সদস্য'র ১ কোটি ২৯ লক্ষ ৪ হাজার ৬০২ টাকা খেলাপী রয়েছে। এছাড়াও ২০২০ সালের ক্ষুদ্রঋন প্রকল্পের আওতায় ১৭৭ জন তাঁতী কে ১ কোটি ৯৭ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা ঋন বিতরণ করা হয় যার মধ্যে ৯৬ জন গ্রাহকের নিকট ৬৯ লক্ষ ৫৩ হাজার ৯৯৬ টাকা খেলাপী রয়েছে।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সাব বেসিক সেন্টার দোগাছির (পাবনা) তথ্যানুযায়ী ক্ষুদ্র ঋন প্রকল্পের আওতায় ১,২৮৭ জন তাঁতী কে ২ কোটি ২৬ লক্ষ ৭৯ হাজার ঋন দেওয়া হয়েছে যার ৬০ শতাংশ খেলাপী ঋণ। এছাড়াও চলতি মূলধন প্রকল্পের  আওতায় ১০৪ জন গ্রাহকের মাঝে ১ কোটি ২৩ লক্ষ ২০ হাজার টাকা প্রদত্ত ঋণের ৫০ শতাংশের বেশি খেলাপী ঋণ যা আদায়ে রীতিমতো নাজেহাল অবস্থা তাঁত বোর্ডে কর্মরত কর্মকর্তা -কর্মচারীদের। ঋণ আদায়ে ঋণ গ্রহীতার বাড়িতে গেলে দেখা যায় অধিকাংশ তাঁতী ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।


বেড়া উপজেলার নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়নের রাকসা সাফুল্লাহ গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, একজন তাঁত মালিক জানান,অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা থাকায় এলাকায় একসময় প্রচুর দাপট ছিল, অনেক অসহায় মানুষকে সহায়তা করেছি। লোকসানে পড়ে আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। নিঃস্ব অবস্থায় মানসম্মানের ভয়ে বাধ্য হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। অনেক মানুষ আমার কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। এই অঞ্চলে অন্তত এক হাজার তাঁত চলতো, এখন অধিকাংশ বন্ধ।

সাঁথিয়া উপজেলার পিপুলিয়া এলাকায় দশটি কারখানা অন্তত তিন শতাধিক তাঁত এখন বন্ধ রয়েছে। এই অঞ্চলের একজন তাঁতী জানান,গুদামে লাখ লাখ টাকার কাপড় পড়ে রয়েছে, কাপড় বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরীর টাকাই দিতে পারছি না। জমি বিক্রি করে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেছি। ৩০০টির বেশি তাঁতের মধ্যে মাত্র কয়েকটি তাঁত চালু রয়েছে আগামীত হয়তো সব বন্ধ রাখতে হবে।

রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স রায় ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী জানান,  চার বছর ধরে বাংলাদেশী তাঁত জাত পণ্যে ভারতীয় শুল্ক আরোপ, ভারত ও বাংলাদেশে ডলারের মুল্যমানের ব্যবধানের কারণে রপ্তানির পরিমাণ অর্ধেকের অনেক নিচে নেমে এসেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ আকার ধারণ করবে বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি। শুল্কমুক্ত হওয়ায় চার বছর পুর্বে ৬টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আতাইকুলা ও শাহজাদপুর কাপড়ের হাঁট থেকে প্রতি সপ্তাহে ৪ লাখ পিচ শাড়ী -লুঙ্গী ভারতে রপ্তানি করতো। এছাড়াও মধ্যপাচ্য  ও ইউরোপে পাবনায় উৎপাদিত কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা ছিল। বর্তমানে এই শিল্পের মহা কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে।

প্রবীণ শিক্ষক আবুল কালাম বলেন, ক্ষুদ্র শিল্পগুলো আজ ধংস প্রায়। এই শিল্প দেশের 
লাখো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়ক । সরকারের নজর দেওয়া দরকার অঞ্চল ভেদে ক্ষুদ্র আকারে শিল্প স্থাপনের। পুঁজি বাদীদে কাছে এই শিল্প জিম্মি হয়ে গিয়েছে। তাই শিল্পগুলো ধংসের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড বেসিক সেন্টার সাঁথিয়া পাবনা'র অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বসুদেব চন্দ্র দাস বলেন, তাঁত শিল্প বন্ধ হওয়ার বড় অন্তরায় হচ্ছে তাঁতিদের উৎপাদিত পন্যের কাঁচামালা যার বাজার সংকট, উচ্চ মূল্য এবং তারা যা উৎপাদন করে তার বাজার হারিয়ে ফেলেছে, বাজার নেই যে কারণে তাঁতিরা তাঁতিরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে, তাঁত বন্ধ হওয়ার আরেকটি কারণ শ্রমিক সংকট। তিনি আরও বলেন সম্ভাবনাময় তাঁতশিল্প কে বাঁচিয়ে রাখতে আমরা উপরোক্ত সমস্যাগুলো উর্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেছি। আশা করছি উচ্চ মহলের তৎপরতায় পাবনার প্রাচীন তাঁতশিল্পে সুদিন ফিরবে হাজারো মানুষ কর্ম পাবে।

Share This Article

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়