জার্মান ভূমিতে মুসলমানদের হাজার বছরের পদচারণা
ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন
ইউরোপের শক্তিধর ও শিল্পোন্নত দেশ জার্মানির দাপ্তরিক নাম ফেডারেল রিপাবালিক অব জার্মানি। ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হলো অটোমোবাইল শিল্প, যন্ত্র ও প্রকৌশল, রাসায়নিক শিল্প, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি। জার্মানির আয়তন প্রায় তিন লাখ ৫৭ হাজার ৬৮৩ বর্গকিলোমিটার এবং ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে জনসংখ্যা আট কোটি ৩৪ লাখ ৬৭ হাজার ১১৭ জন। যাদের বেশির ভাগ খ্রিস্টধর্মের অনুসারী।
মুসলিমরা জার্মানির দ্বিতীয় বৃহৎ ধর্মীয় জনগোষ্ঠি। বর্তমানে প্রায় ৫৫ লাখ মুসলিম জার্মানে বসবাস করে। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ জার্মান নাগরিক। জার্মান মুসলিমদের বড় অংশই তুর্কি বংশোদ্ভূত। বার্লিন জার্মানি রাজধানী শহর।
জার্মানির সঙ্গে ইসলাম ও মুসলমানের যোগাযোগ হাজার বছরের প্রাচীন। উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের শাসনামলে (৭২৪-৭৪৩ খ্রি.) মুসলিম বাহিনী ফ্রান্সের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করার পর জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে উপস্থিত হয়। মুসলিম বাহিনী বাডেন-ভুর্টেমবার্গ ও বাভারিয়ার পশ্চিম অঞ্চলে অভিযান চালিয়েছিল। তবে জার্মানির মাটিতে মুসলিম বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কখনোই স্থায়ী হয়নি।
জার্মানির সঙ্গে মুসলমানদের যোগাযোগের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছিল কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে ক্যারোলিঞ্জীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শার্লেমেন ও খলিফা হারুনুর রশিদের ভেতর কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল। তাঁদের ভেতর পত্র ও উপহার বিনিময় হয় এবং তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে কিছু বিষয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ হন। ৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে শার্লেমেন খলিফা হারুনুর রশিদের কাছে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। তিনি অনুরোধ করেন হেজাজের খ্রিস্টান জনগোষ্ঠি ও জেরুজালেমের খ্রিস্টান তীর্থ যাত্রীদের যেন নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। তিনি বাগদাদ ও আখেনের ভেতর কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনেও আগ্রহ প্রকাশ করেন।
খলিফা হারুনুর রশিদের তাঁর আহ্বানে সাড়া দেন। তিনিও জার্মান ভূমিতে (ফ্রাংকিশ সাম্রাজ্যে) মুসলমানদের নিরাপত্তা প্রদানের অনুরোধ করেন। খলিফা জার্মান শাসকের জন্য বিপুল পরিমাণ উপহার পাঠান। যার ভেতর ছিল মূল্যবান রত্নপাথর, সুগন্ধি, রেশম কাপড়, জলচালিত ঘড়ি ও আবুল আব্বাস নামক বিশাল হাতি ছিল। ঐতিহাসিক এই কূটনৈতিক বিনিময় থেকে ধারণা পাওয়া যায় ইসলামের প্রথম শতাব্দী থেকেই জার্মান অঞ্চলের সঙ্গে মুসলমানদের যাতায়াত ও যোগাযোগ ছিল। তবে খ্রিস্টীয় সপ্তদশ বা অষ্টদশ শতাব্দীর আগে জার্মানিতে মুসলমানদের স্থায়ী বসবাসের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
ষোড়শ শতাব্দী থেকে উসমানীয় শাসকদের সঙ্গে ইউরোপীয় শাসক গোষ্ঠির সংঘাত শুরু হয়। বিশেষত হাবসবার্গদের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়। বিভিন্ন সামরিক অভিযানের সময় হাজার হাজার মুসলিম সৈনিক ও বেসামরিক ব্যক্তি বন্দি হন। তাদের মধ্যে অনেককে যুদ্ধবন্দি, দাস কিংবা বাধ্যতামূলক শ্রমিক হিসেবে উত্তর দিকে বিভিন্ন জার্মান রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়।
সমসাময়িক নথিতে দেখা যায়, এদের কেউ কেউ সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী কিংবা অভিজাত পরিবারের অধীনে কাজ করত। পরবর্তীতে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ১৬০৯ সালে আহমেদ কেথুদার নেতৃত্বে ভিয়েনা ও প্রাগে কূটনৈতিক মিশন শুরু করে। এতে ১৫০ জন কর্মী ছিলেন। এসব ঘটনার মাধ্যমে মুসলিম দূত, দোভাষী ও তাঁদের সহকারীরা সাময়িকভাবে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন কেন্দ্রে উপস্থিত হলেও তাঁদের অবস্থান ছিল স্বল্পমেয়াদি।
৯ নভেম্বর ১৭৬৩ উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রথম রাষ্ট্রদূত আহমেদ রেসমি এফেন্দি ৭৩ জন সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে বার্লিনে পৌঁছান। তিনি বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন। ১৭৯৮ সালে প্রুশিয়ার রাজা তৃতীয় ফ্রেডরিক উইলিয়াম এক উসমানীয় কূটনীতিকের মৃত্যুর পর ইসলামী রীতি অনুযায়ী তাঁর দাফনের অনুমতি দেন। ফলে বার্লিনে প্রথম মুসলিম কবরস্থানের প্রতিষ্ঠা হয়। তবে সে সময় জার্মান ভূখণ্ডে কোনো মসজিদ, মাদরাসা বা আত্মনির্ভরশীল মুসলিম জনপদ গড়ে ওঠার প্রমাণ পাওয়া যায় না।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে, প্রুশিয়ার প্রথম ফ্রেডরিক উইলিয়ামের অধীনে ২০ জন মুসলিম সৈন্য কর্মরত ছিলেন। ১৭৪৫ সালে, প্রুশিয়ার দ্বিতীয় ফ্রেডরিক প্রুশিয়ান সেনাবাহিনীতে ‘মুসলিম রাইডার্স’ নামে একটি মুসলিম ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেন, যা প্রধানত বসনিয়াক, আলবেনিয়ান এবং তাতারদের নিয়ে গঠিত ছিল। ১৭৬০ সালে প্রায় এক হাজার সদস্য নিয়ে একটি বসনীয় মুসলিম কোর প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৯৮ সালে বার্লিনে একটি মুসলিম কবরস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়, আজও বিদ্যমান।
তথ্যঋণ
বই: আল ইসলামু ওয়াল মুসলিমুনা ফিল আলমানিয়া; হিস্টোরি অব ইসলাম ইন জার্মানি;
প্রবন্ধ: মুসলিম লাইফ ইন জার্মানি