কিংবদন্তীর লবলং সাগর ও মুসলিম কল্পকথা

ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন

প্রকাশিতঃ বিকাল ০৫:০৮, শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
ছবি: সংগৃহীত।

ছবি: সংগৃহীত।

আনমনা মুহূর্তে ভালুকা শ্রীপুরের বনবীথিকা, শিল্পাঞ্চল ও নদী-পাথারের গহীনতা হতে যদি কানে বাজে মায়াবী সুর :
‘এই ছিল নসিবের লেখা না পাইলাম দোস্তের দেখা,
মরণ হইল মধ্য সমূদ্রে...!’
এমনই দীর্ঘশ্বাসে লুকিয়ে আছে ‘লবলং সাগর বাঁকে মুসলিম লোকগাঁথা’ হাজার বছরের ঐতিহ্য। বিশ্ব সাহিত্যের অমরকীর্তি ‘আলিফ লায়লা’ ইসলামের স্বর্ণযুগের লোকগল্প। পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ এশীয় কবি-সাহিত্যিক, গবেষক ও অনুবাদকগণ আরব, পারস্য, ভারত, মিসর, মেসপেটমিয়ায় প্রচলিত এসব লোককাহিনির সংগ্রাহক। অন্যগুলো পাহলভি সাহিত্য এবং এরই খানিকটার সঙ্গে ভারতীয় উপাদান মিশ্রিত।

সপ্তদশ শতাব্দী বা ১৬৬০খ্রি.-এরও আগে রচিত মিশর পারস্যের কল্পকথা ‘সাইফুল মুল্লুক ও বদিউজ্জামাল’ অনন্য রোমান্টিক সৃষ্টি। অতিপ্রাচীন প্রেমকাহিনি অবলম্বনে দোনাগাজী চৌধুরী, ইব্রাহিম, মুন্সি মালে মুহম্মদ ও আলাওল এ সাহিত্যের কারিগর। ‘সয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামাল’-এর আদি উত্স ‘আলিফ লায়লা’।

পাত্র-পাত্রী এক যুবরাজ ও পরীকন্যার প্রেম ভালবাসা, এডভেঞ্চার, বিশ্বাস, জাদু, দুঃখ-দুর্দশা, বিশ্বাসঘাতকতার বিষাদময় কাহিনি; লোককবিদের নিজস্বভাবনা মিশেলে বিকশিত রহস্যঘেরা কল্পচিত্র:
‘নীল নদের দেশে ছয়ফলমুলুুক নামে বসতি এক যুবরাজ।

যেমনি ছিল দেখতে সুদর্শন তেমনি ছিল তার বীরত্বের গুণকীর্তন...
স্বপ্নে সে দেখল চার দিক পাহাড় বেষ্টিত এক মনোরম সরোবর।
যার নির্মল সবুজাব জলারাশীতে পরে পূর্ণিমার চাঁদের বিচ্ছোরণ,
সরোবরের জলে সাতটি পরীতে স্নান করে খুলে রেখে তার ডানা
সরু মসৃন দেহ পল্লবিত নীল চোখ চুল যেন তাদের বেণী খুলা ঝর্ণা।
...মুখটি যেন তার পুর্ণশশী সে হল ‘বদিউ’ হাসিতে যখন তার মুক্তা ঝরে
দেখে তাই ‘ছয়ফ’ হয়ে যায় বিমুর্ত ভাষাহীন জল নিয়ে চোখে উঠে জেগে
বদরুজ্জামাল পরী এমনতর রূপসী জীবনে সে কভু দেখেনি এর আগে’।

ছয়ফলমুলুুকের পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া জাদুকরি সোলেমানি আংটি তাকে পথ দেখায়, স্বপ্নের সরোবরটি হিমালয়ের ‘কাগান’ উপতক্যায়! প্রেমেরটানে জাহাজ ভাসানো হলো। পথে লোহিত সাগর, মিসর, আরব, পারস্য, কোহে-কাফ; আরও দেশ-দেশান্তর:
‘...বছর ছয়েক ধরে ছাইফ খুঁজল তাকে তন্ন তন্ন করে নীল নদের ঠিকানায়
করল বিচরণ আলেকজান্দ্রিয়া হতে শুরু করে সিনাই-এর প্রতিটি কোণায়
রাস্তায় ঘুরে চোখ লাল চুল উসকু ছেঁড়া তার জুতা প্রেম দ্বারা হয় তার ক্ষয়
মানুষ আর চিনে না তারে যেখানে যায় সকলেই তারে পাগল বলেই কয়’।


ছয়ফলমুলুুকের হিমালয় যাত্রায় প্রাসঙ্গিকভাবেই কাহিনি গড়ায় বাংলাদেশে। বাঙালি মানসে লোহিত সাগরই ‘লবলং’! মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ‘ছয়ফলমুলুুক-বদিউজ্জামাল’-এর বাংলা পুঁথি-পালার কাল্পনিক উপাখ্যানটি যাত্রাগানের আদলে চালু হয়। ষাটের দশকে ভাওয়ালাঞ্চলে পথে ঘাটে অহরহ বাজত:
‘জামাল রূপে পাগল হয়ে
দেশ ছাড়িলাম জাহাজ লয়ে
ডুবল জাহাজ লবলং সাগরে
আমারে যে ধইরা নিল
দেও দানবে...।’

‘লবলং সাগরে জাহাজ ডুবি’র ঐতিহাসিক সত্যতা আপেক্ষিক। তবে গাজীপুরের শ্রীপুরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রাকৃতিক জলাধার লবলং সাগর। ময়মনসিংহের ভালুকার খিরু নদী থেকে উত্পন্ন- শ্রীপুরের রাথুরা শালবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মাওনা ছাড়িয়ে পিরুজালি-মির্জাপুরের কাছে তুরাগে মিশেছে লবলং। সাগরের বিশালতা ও পানির লবণাক্ততার জন্যই জলাধারটি স্থানীয়ভাবে ‘লবলং’ বা লবণদহ’ নামে খ্যাত! প্রাণবন্ত লবলং-এ ভাসত ‘সোনার নৌকা, পবনের বৈঠা’! চলত পালতোলা বজরা-নৌকা; শোনা যেত মাঝি-মাল্লার ব্যাকুল সুরমূর্চ্ছনা। 
প্রাচীনকালে লবলং-এর বাঁকে মাথাউঁচু করে দাঁড়ায় কৃষি-অর্থনীতি। গাজীপুর শ্রীপুর ভালুকায় শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারণেই শুরু লবলং সাগরের দুর্দশা! অপরিশোধিত বিষাক্ত রাসায়নিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যে পানি সম্পূর্ণ দূষিত হয়ে প্রাকৃৃতিক স্রোতধারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষিজমিও অনাবাদি থাকছে। প্রায় ৩০ কিলোমিটার জুড়ে দখল দূষণে শ্রীপুর অংশের পানি এখন দুর্গন্ধযুক্ত ও ব্যবহারের অনুপযোগী। অতিমাত্রায় দূষণে নেই মাছ। পাওয়া যায় না সাপ ব্যাঙও!

লবলং সাগরকে দখলমুক্ত করতে এবং স্বাভাবিক প্রবাহ ফেরাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্প গ্রহণ করলেও রূঢ়সত্য এটাই, পুরোপুরি দখলমুক্ত না হলে এবং শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে না আনলে লবলং-এর ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে স্মৃতির অতলান্ত অন্ধকারে!

বস্তুতঃ কিংবদন্তী-লোককথা সীমাহীন বিস্ময় স্বত্বা ভূগোল ও বিশ্বাসের বাইরে অর্ধসত্য অর্ধ-প্রামাণ্যতার আকর্ষণে হেঁটে বেড়ায় যুগ-যুগান্তরে দেশ-দেশান্তরের পথে প্রান্তরে। কাজেই, বৃহত্তর ময়মনসিংহ আর অখণ্ড ঢাকা অঞ্চলের আবেগময় আশ্রয় লবলং।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ

Share This Article

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়