আলামপুর ষাট আউলিয়ার দরবার…
বিএমএফ টেলিভিশন ডেস্ক || বিএমএফ টেলিভিশন
কুষ্টিয়া জেলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন ইতিহাস ও লোকজ ঐতিহ্য। এমনই এক অনন্য আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান হলো কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আলামপুর ইউনিয়নের আলামপুর গ্রামে অবস্থিত 'ষাট আউলিয়ার দরবার শরীফ'। বহু প্রাচীনকাল থেকে এই দরবার শরীফ সুফি-সাধক এবং পীর-আউলিয়াদের স্মৃতি বহন করে আসছে। এই পবিত্র চত্বরের প্রধান আকর্ষণ হলো লোকগাথার অমর চরিত্র কালু গাজীর আস্তানা, প্রাঙ্গণের অভ্যন্তরে থাকা একটি কালী মন্দির এবং প্রায় দশ-পনেরো কাঠা জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এক রহস্যময় প্রাচীন বটগাছ।
লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে যে, একসময় এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আগমন করেছিলেন ষাটজন সুফি সাধক বা আউলিয়া। জনশ্রুতি আছে যে, এই স্থানে বসেই সেই ষাট জন আউলিয়া ধর্ম প্রচারের কর্মপরিকল্পনা ও বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বিষয়ে আলোচনা করতেন। তাঁদের সেই ঐতিহাসিক বৈঠকের স্মৃতি থেকেই এই স্থানটির নাম পরবর্তীতে 'ষাট আউলিয়ার দরবার' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
আলামপুরের এই দরবার শরীফটি মূলত সেইসব আউলিয়া ও সুফিদেরই স্মৃতিধন্য, যাঁরা এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন। দরবার শরীফ চত্বরের সবচেয়ে নজরকাড়া প্রাকৃতিক নিদর্শন হলো এর শতবর্ষী বিশাল বটগাছটি। গাছটি কোনো সাধারণ জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়; প্রায় দশ-পনেরো কাঠা জমিজুড়ে এর ডালপালা ও ঝুরিগুলো মাটির ওপর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এক সুশীতল, ছায়াস্নিগ্ধ ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করেছে। স্থানীয়দের গভীর বিশ্বাস জড়িয়ে আছে এই বিশাল বটগাছটিকে ঘিরে। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে রোগমুক্তি বা মনের নানা কামনাবাসনা পূরণের উদ্দেশ্যে ভক্তরা এই গাছের ডালে সুতো বা পলিথিন বেঁধে মানত করে থাকেন। বিস্তৃত বটগাছটির পবিত্রতা ও অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে মানুষের মুখে মুখে একটি ভীতিজাগানিয়া কল্পকথা প্রচলিত আছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই প্রাচীন বটগাছের কোনো ডালপালা বা অংশ কেউ যদি কেটে বা ভেঙে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বা নিয়ে যায়, তবে সে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং নানা বিপদগ্রস্ত বা ক্ষতির মুখে পড়ে। এই ভক্তি ও ভয়ের মিশ্রিত বিশ্বাসের কারণে আজও গাছটির ডালপালা সবাই পরম যত্নে অক্ষত রেখে দেয়।
এই দরবার শরীফ প্রাঙ্গণে একই সাথে কালু গাজীর আস্তানা ও হিন্দু ধর্মের কালী মন্দিরের অবস্থান এবং এগুলোকে কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠা এই বিশাল বটগাছটি যেন বাংলার শাশ্বত অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক জীবন্ত প্রতীক। শত বছরের পুরনো এই বটগাছের শীতল ছায়াতলে আস্তানা আর মন্দিরের সান্ধ্য আরতি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে আলামপুরের এই পুণ্যভূমি প্রমাণ করে দেয় যে, প্রকৃতি ও লোকজ বিশ্বাসের টানে মানুষে মানুষে কোনো দূরত্ব থাকে না; বরং বটগাছের বিস্তার এবং আস্তানা-মন্দিরের এই মেলবন্ধন সমগ্র অঞ্চলটিকে এক অনন্য আধ্যাত্মিক ঐক্যে বেঁধে রেখেছে।