দেশের চাহিদা মিটিয়ে অস্ত্র যাবে বিদেশে: সেনাপ্রধান

ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন

প্রকাশিতঃ দুপুর ০১:৪২, শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
ছবি: সংগৃহীত।

ছবি: সংগৃহীত।

সমরাস্ত্রে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পথে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। দেশের চাহিদা পূরণের পর উৎপাদিত অতিরিক্ত সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্য সামনে রেখে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে গড়ে উঠছে দেশের দ্বিতীয় অর্ডন্যান্স উৎপাদন কেন্দ্র। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জলিল টেক্সটাইল মিলের প্রায় ৫৫ একর জমি ও স্থাপনায় বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির (বিওএফ) সম্প্রসারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া এ কারখানায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, আনসার-ভিডিপিসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা ও আধা-সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

ফলে সীতাকুণ্ডের এ উদ্যোগ দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে উৎপাদন থেকে রপ্তানিমুখী প্রতিরক্ষা শিল্পের দিকে এগিয়ে নেওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বৃহস্পতিবার সকালে ফৌজদারহাটে বিটিএমসি থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে জমি ও স্থাপনা হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রতিরক্ষা শিল্পের এই পরিকল্পনার কথা জানান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।

তিনি বলেন, শুধু বিদেশ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমদানি করে যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব নয়। নিজেদের প্রয়োজনীয় ফায়ারিং সরঞ্জাম ও সামরিক উপকরণ নিজেদেরই উৎপাদন করতে হবে। এ কারণে প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সেনাপ্রধানের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন কারখানার লক্ষ্য কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত উৎপাদন আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে একদিকে সমরাস্ত্র আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন খাতও গড়ে উঠতে পারে।

নতুন কারখানায় উৎপাদিত সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের পরিধিও বিস্তৃত। তিন সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা ও আধা-সামরিক বাহিনীর চাহিদা পূরণের লক্ষ্য রয়েছে। এতে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার আওতা বাড়ার পাশাপাশি সংকটকালীন সময়ে বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে নিজস্ব সরবরাহ সক্ষমতা গড়ে তোলাও সম্ভব হবে।

কারখানার জন্য সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটকে বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে কৌশলগত ও লজিস্টিক সুবিধা। পাহাড়ঘেরা অবস্থান সামরিক স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় কাঁচামাল আমদানি এবং ভবিষ্যতে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে পরিবহন সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সড়ক ও রেল যোগাযোগের সুবিধাও বৃহৎ শিল্প স্থাপনার জন্য সহায়ক।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জলিল টেক্সটাইল মিলের প্রায় ৫৫ একর জমি ও স্থাপনা এ প্রকল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে। গত ১ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে জমিটি প্রতীকী মূল্যে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।

এর ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার জমি ও স্থাপনা হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বিটিএমসির পক্ষে চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম জাহিদ হাসান এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষে মিলিটারি এস্টেট অফিসার মিসেস সাজিয়ে তাহের স্বাক্ষর করেন।

অনুষ্ঠানে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, বস্ত্র ও পাট সচিব শরফ উদ্দিন আহমদসহ সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গাজীপুর সেনানিবাসে বিদ্যমান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির পর সীতাকুণ্ডে দ্বিতীয় উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে দেশীয় উৎপাদন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির পর্যায়ে যেতে হলে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, গবেষণা ও উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদনব্যবস্থা এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সমরাস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিধিবিধান ও অনুমোদন প্রক্রিয়াও অনুসরণ করতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এর সুফল প্রতিরক্ষা খাতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। সামরিক শিল্পকে কেন্দ্র করে প্রকৌশল, ধাতু, যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিকস ও অন্যান্য সহযোগী শিল্পের বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দক্ষ কারিগরি জনবল তৈরির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে। ফলে সীতাকুণ্ডের নতুন কারখানা দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় শিল্প ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।

দেশের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত সমরাস্ত্র বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সীতাকুণ্ডের এই কারখানা শুধু তিন বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর রসদ জোগানোর কেন্দ্র থাকবে না, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকে পরনির্ভরতা থেকে আত্মনির্ভরতা এবং উৎপাদন থেকে রপ্তানির পথে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
 

Share This Article

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়