কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ কি ইসলামে জায়েজ?
ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন
জীবনের ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো বিয়ে। তবে এই বিয়েরই একটি আলোচিত ধরণ হলো ‘মুতা বিবাহ’ বা কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ। যা ইসলামের সূচনালগ্নে একটি সীমিত প্রেক্ষাপটে অনুমোদিত থাকলেও পরবর্তীকালে সুস্পষ্টভাবে এবং চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়।
জাহেলিয়াতের যুগে বিবাহ ও সম্পর্কের কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো ছিল না, নৈতিক বিশৃঙ্খলা ছিল সমাজের স্বাভাবিক চিত্র। ইসলাম সেই বিশৃঙ্খল বাস্তবতাকে তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে না দিয়ে ধীরে ধীরে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, মর্যাদাপূর্ণ ও দায়বদ্ধ পারিবারিক কাঠামোর দিকে পরিচালিত করে।
এই প্রক্রিয়ায়, বিশেষত দীর্ঘ সফর, যুদ্ধাবস্থা ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে, মুতা বিবাহ সাময়িকভাবে অনুমোদিত ছিল, একটি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে, চূড়ান্ত বিধান হিসেবে নয়।
কিন্তু ইসলামের বিধান যখন পূর্ণতা লাভ করে, তখন এই সাময়িক ব্যবস্থার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট থাকে না। বরং এটি স্থায়ী বিবাহব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। ফলে রাসুলুল্লাহ সা. স্বয়ং এটিকে স্পষ্ট ভাষায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
মুতা বিবাহ কী?
মুতা বিবাহ (نكاح المتعة) হলো একটি নির্দিষ্ট সময় ও মোহরের বিনিময়ে সম্পাদিত অস্থায়ী বা সাময়িক বিয়ে, যা সময়ের মেয়াদ শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। ইসলামের প্রথম দিকে এর অনুমতি থাকলেও, পরবর্তীতে রাসুল (সা.) এটি চিরতরে নিষিদ্ধ করেন
সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় সাহাবি সাবরা আল-জুহানী রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. আমাদেরকে মুতা করার অনুমতি দিয়েছিলেন, অতঃপর তিনি তা নিষিদ্ধ করেন।
আরেকটি বর্ণনায় নবী সা. ঘোষণা করেন, আমি তোমাদের মুতা করার অনুমতি দিয়েছিলাম, এখন আল্লাহ তা কিয়ামত পর্যন্ত হারাম করে দিয়েছেন।
এই ঘোষণা ইসলামের চূড়ান্ত আইনগত অবস্থানকে সুস্পষ্ট করে দেয় যেখানে কোনো ব্যতিক্রম বা পুনরুজ্জীবনের সুযোগ নেই।
ফিকহশাস্ত্রের ইতিহাসে চার মাযহাবের ইমামগণ এ বিষয়ে ঐকমত্যে উপনীত হয়েছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ. তার মাযহাবে মুতা বিবাহকে স্পষ্টভাবে অবৈধ ঘোষণা করেন।
ইমাম মালিক ইবন আনাস রহ. তার কিতাব মুয়াত্তা ও অন্যান্য সূত্রে এটিকে বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করেন।
ইমাম মুহাম্মদ ইবন ইদরিস আশ-শাফেয়ী রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থে উল্লেখ করেন, মুতা একসময় বৈধ ছিল, কিন্তু পরে তা রহিত হয়েছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আর ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল রহ. এর মাযহাবেও এটি সুস্পষ্টভাবে হারাম হিসেবে নির্ধারিত।
ইসলামী ঐতিহ্যে খলিফা হযরত উমর রা. এর অবস্থান এ প্রসঙ্গে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ঘোষণা করেন, রাসুলুল্লাহ সা. এর যুগে দুটি মুতা ছিল, আমি তা নিষিদ্ধ করছি এবং এ জন্য শাস্তি দেব।
আলেমরা একমত যে, এটি কোনো নতুন বিধান প্রবর্তন নয়, বরং নববী নির্দেশনার প্রশাসনিক বাস্তবায়ন যেখানে একটি ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ বিষয়কে সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
মুতা বিবাহ রহিত হওয়ার পেছনে যে হিকমত কাজ করেছে, তা ইসলামের সামগ্রিক জীবনদর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ইসলাম বিবাহকে কেবল দেহগত প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখে না, বরং এটি একটি স্থায়ী, মর্যাদাপূর্ণ ও দায়বদ্ধ সম্পর্ক যার মাধ্যমে পরিবার গড়ে ওঠে, বংশধারা সংরক্ষিত হয়, এবং নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
মুতা এই স্থিতিশীল কাঠামোর বিপরীতে একটি সাময়িক ও অনিশ্চিত সম্পর্ক তৈরি করে, যা ইসলামের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
সমসাময়িক বিশ্বে কিছু মহল থেকে মুতা বিবাহকে পুনরুজ্জীবিত করার যে প্রচেষ্টা দেখা যায়, তা মূলত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করে শরীয়তের চূড়ান্ত অবস্থানকে পাশ কাটানোর প্রয়াস। অথচ ইসলামের শিক্ষা স্পষ্ট যা রহিত হয়েছে, তা আর শরীয়তের অংশ নয়, বরং তা ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত, অনুসরণের নয়।
অতএব, মুতা বিবাহ ইসলামের আইনগত বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন যা প্রমাণ করে, ইসলাম মানবসমাজকে ধীরে ধীরে একটি পরিপূর্ণ, নৈতিক ও সুশৃঙ্খল জীবনের দিকে পরিচালিত করেছে। সেই পরিপূর্ণতার আলোতেই আজ মুতা বিবাহ একটি নিষিদ্ধ, পরিত্যাজ্য ও অতীতের অধ্যায় যা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়, কিন্তু যার অনুসরণ আর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।