সাহাবায়ে কেরামের জ্ঞান আহরণ ও বিতরণ
ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন
ইলম বা জ্ঞান শুধু অর্জনের বিষয় নয়—এটি একটি আমানত, একটি দায়িত্ব। আর এই দায়িত্ব পালনে যাঁরা সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাঁরা হলেন সাহাবায়ে কেরাম (রা.)। তাঁরা জ্ঞান অর্জনের জন্য যেমন কষ্ট, ত্যাগ ও ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করেছেন, তেমনি সেই জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেও ছিলেন নিরলস ও উদার। তাঁদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ফুটে ওঠে ইলমের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং নববী শিক্ষার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা। তাইতো ওয়াবিসা (রা.) প্রতি ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের দিনে ‘রাক্কা’ শহরের বড় মসজিদে দাঁড়িয়ে মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণের পুনরাবৃত্তি করে বলতেন, এসো। নবীজি (সা.) যেমন আমাদের কাছে দ্বিন পৌঁছিয়েছেন তেমনি আমরা তোমাদের কাছে দ্বিনের বাণী পৌঁছে দিই। (কাশফুল আসতার, হাদিস : ১৪৫)
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ছিলেন মহানবী (সা.)-এর সরাসরি ছাত্র। তাঁরা তাঁর প্রতিটি কথা, কাজ ও অনুমোদন গভীর মনোযোগের সাথে গ্রহণ করতেন এবং তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা এই জ্ঞানকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াকেও নিজেদের ঈমানী দায়িত্ব মনে করতেন। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পরের ঘটনা, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) একজন আনসারিকে ডেকে বলেন, আজ অনেক সাহাবি আমাদের মাঝে আছেন। চল, তাদের কাছ থেকে ইলম অর্জন করি। আনসারি বলল, বড় বড় সাহাবিরা জীবিত আছেন, তাদের ছেড়ে কে আমাদের কাছে হাদিস জানতে আসবে? ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমি তার কথায় কান দিলাম না। আমি সাহাবায়ে কেরামের ঘরে ঘরে গিয়ে রাসুল (সা.)-এর হাদিস অন্বেষণ করতে লাগলাম। যার কাছেই কোনো হাদিস আছে বলে শুনতাম, তার বাড়িতেই যেতাম। কারও বাড়িতে এসে হয়তো দেখতাম, তিনি ঘুমিয়ে আছেন। আমি তখন চাদর বিছিয়ে দরজার সামনেই বসে পড়তাম। ধুলোবালি পড়ে আমার শরীর মলিন হয়ে যেত। সাহাবি ঘুম থেকে উঠে আমাকে দেখে চমকে উঠতেন এবং বলতেন, হে রাসুলের চাচাতো ভাই! আপনি কেন এসেছেন? খবর দিলেই তো আমি আপনার কাছে হাজির হতাম। আমি তখন বলতাম, জ্বী না। আমারই আপনার কাছে আসা উচিত। এভাবে তার কাছ থেকে হাদিসটি শিখে নিতাম। এর কিছুকাল পর ইলমে নববীর অন্বেষণে আমার চারপাশে অসংখ্য মানুষের ভিড় দেখে ওই আনসারি বলছিলো, এই যুবক বড়ই বুদ্ধিমান। (মুসতাদরাকে হাকেম, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ৭৩)
ইলমের প্রতি মহানবী (সা.)-অপরিসীম মর্যাদা ও গুরুত্ব থাকার কারণে সাহাবারা এই গুণের অধিকারীদেরও সম্মান করতেন। বর্ণিত আছে, জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) যখন সফরের জন্য বাহনে পা রাখতেন তখন ইবনে আব্বাস (রা.) বাহনের রেকাব (পা রাখার অংশ) ধরে সাহায্য করতেন। জায়েদ (রা.) বলতেন, ছেড়ে দাও হে রাসুলের চাচাতো ভাই। কিন্তু ইবনে আব্বাস (রা.) বলতেন, ‘আমরা আলেমদের সঙ্গে এভাবেই সম্মান প্রদর্শনে আদিষ্ট হয়েছি।’ (বাইহাকি, হাদিস : ১৩৭১৭)
সাহাবায়ে কেরামের জীবন আমাদের জন্য শিক্ষার এক অনন্য উত্স। তাঁদের ইলমের প্রতি ভালোবাসা, ত্যাগ, ধৈর্য এবং জ্ঞান প্রচারের উদ্দীপনা আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আজকের যুগে, যখন জ্ঞান অর্জন অনেক সহজ, তখন তাঁদের মতো নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা আমাদের মধ্যে কতটুকু আছে—তা ভেবে দেখা জরুরি।
আমাদের উচিত, তাঁদের অনুসরণ করে শুধু জ্ঞান অর্জনেই সীমাবদ্ধ না থাকা, বরং তা সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।