বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণা

ফিচার রিপোর্ট: || বিএমএফ টেলিভিশন

প্রকাশিতঃ দুপুর ১২:৩৬, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ২২ পৌষ ১৪৩২
ছবি: বিএমএফ টেলিভিশন।

ছবি: বিএমএফ টেলিভিশন।

অনলাইন ম্যারেজ মিডিয়ার ফাঁদে বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যে উন্মোচিত এক নীরব প্রতারণা চক্র বিয়ে—একটি সামাজিক, ধর্মীয় ও ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই বর্তমানে অনলাইনে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ প্রতারণা চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যারেজ মিডিয়া বা ঘটক গ্রুপের নামে পরিচালিত এই চক্রের ফাঁদে পড়ে দেশে ও বিদেশে বসবাসরত অসংখ্য মানুষ সর্বস্ব হারাচ্ছেন। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই প্রতারণার প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছেন।

অনলাইন ম্যারেজ মিডিয়ার ফাঁদে বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যে উন্মোচিত এক নীরব প্রতারণা চক্র বিয়ে—একটি সামাজিক, ধর্মীয় ও ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই বর্তমানে অনলাইনে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ প্রতারণা চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যারেজ মিডিয়া বা ঘটক গ্রুপের নামে পরিচালিত এই চক্রের ফাঁদে পড়ে দেশে ও বিদেশে বসবাসরত অসংখ্য মানুষ সর্বস্ব হারাচ্ছেন। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই প্রতারণার প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছেন।

ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন—“এক ক্লিকেই পাত্র–পাত্রী”, “১০ দিনের মধ্যে পছন্দ না হলে টাকা ফেরত”, “শরীয়াহ্ সম্মত ব্যবস্থা”—এই আশ্বাসগুলো বিশ্বাস করে অনেকেই প্রতারিত হচ্ছেন। টাকা নেওয়ার পর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং নিয়মিত ঘটনা।

অনলাইন ম্যারেজ মিডিয়ার বিস্তার: সুযোগ না ফাঁদ?

গত এক দশকে অনলাইন ম্যারেজ মিডিয়ার বিস্তার চোখে পড়ার মতো। আগে যেখানে পরিবার, আত্মীয় বা পরিচিত ঘটকের মাধ্যমে বিয়ে হতো, সেখানে এখন অনলাইনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনেক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের “বিশ্বস্ত ম্যারেজ মিডিয়া” হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপনগুলোতে দাবি করা হয়—
• সুন্দরী ও শিক্ষিত পাত্রী
• প্রবাসীদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ
• দ্বিতীয় বিয়ে বা মাসনার জন্য আলাদা ব্যবস্থা
• সরাসরি পাত্র–পাত্রীর মোবাইল নম্বর

কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসবের বড় একটি অংশের কোনো নিবন্ধন, অফিসিয়াল ঠিকানা বা জবাবদিহি নেই। সব কার্যক্রম পরিচালিত হয় ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ও ইনবক্স নির্ভর কথোপকথনের মাধ্যমে।

প্রতারণার কৌশল: ধাপে ধাপে ফাঁদ

ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় প্রতারণার ধরন প্রায় একই—

প্রথম ধাপ: আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি
দ্বিতীয় ধাপ: নাম, বয়স, ঠিকানা, শিক্ষা, পরিবার, ব্লাড গ্রুপ, ডিভোর্স বা সন্তান সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ
তৃতীয় ধাপ: বিভিন্ন ক্যাটাগরির নামে রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারণ
চতুর্থ ধাপ: বিকাশ/নগদ/রকেটের মাধ্যমে অর্থ আদায়
পঞ্চম ধাপ: আশ্বাস → সময়ক্ষেপণ → যোগাযোগ বন্ধ

ফি সাধারণত ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে রাখা হয়, যাতে মানুষ সন্দেহ না করে।

ভুক্তভোগীদের কণ্ঠে বাস্তব গল্প

“টাকা পাঠানোর পর আর কোনো রেসপন্স নেই”

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কাউসার বলেন,

“আমি বিজ্ঞাপন দেখে তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। সে আমাকে অনেকগুলো মেয়ের সিভি আর ছবি দেয়। এরপর বলে—রেজিস্ট্রেশন করলে ফুল সিভি আর অভিভাবকের নম্বর দেওয়া হবে।”

তিনি আরও বলেন,

“আমি যথাযথভাবে তার বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাই। কিন্তু টাকা পাঠানোর পর থেকেই সে আর কোনো রেসপন্স করছে না। এখন বারবার বললেও পাত্তা দিচ্ছে না।”

“১০ দিনের কথা ছিল, মাস পেরিয়ে গেছে”

দুবাই প্রবাসী রফিক বলেন,

“ওরা বলেছিল ১০ দিনের মধ্যে পাত্রী না পেলে টাকা ফেরত। আমি বিশ্বাস করেই টাকা পাঠাই। কিন্তু আজ অনেক দিন হয়ে গেছে—না পাত্রী, না টাকা।”

“বিদেশে থাকি বলেই সহজ টার্গেট”

সৌদি আরব প্রবাসী কামাল বলেন,

“দেশে থাকলে যাচাই করা যেত। বিদেশে থাকায় সব অনলাইনে বিশ্বাস করতে হয়েছে। টাকা পাঠানোর পর কয়েকটা অস্পষ্ট ছবি পাঠিয়ে পরে আর কথা বলে না।”

“সব তথ্য নেওয়ার পর উধাও”

কাতার প্রবাসী মাহমুদ বলেন,

“নাম, বয়স, ঠিকানা থেকে শুরু করে পরিবারের সব তথ্য নেয়। টাকা পাঠানোর পর হঠাৎ করেই যোগাযোগ বন্ধ।”

“দেশে না থাকায় যাচাইয়ের সুযোগ পাইনি”

মালয়েশিয়া প্রবাসী আরিফ বলেন,

“কম টাকায় বড় সুবিধার কথা বলায় সন্দেহ হয়নি। পরে বুঝি—সবই ফাঁদ।”

একটি নাম বারবার উঠে আসছে

ভুক্তভোগীদের একাধিক বক্তব্যে একটি নাম ঘুরেফিরে এসেছে—বাদল। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজেকে অনলাইন ঘটক বা ম্যারেজ মিডিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে রেজিস্ট্রেশন ফি আদায় করেন।

ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়—
• বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ
• মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পেমেন্টের নির্দেশ
• টাকা নেওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ

কেন প্রবাসীরাই বেশি ঝুঁকিতে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসীরা কয়েকটি কারণে বেশি ঝুঁকিতে—
• দেশে না থাকায় যাচাইয়ের অভাব
• পরিবার ও সমাজের চাপ
• দ্রুত বিয়ের প্রয়োজন
• আবেগ ও বিশ্বাসের ওপর নির্ভরতা

এই দুর্বলতাগুলোই প্রতারক চক্র কাজে লাগাচ্ছে।

কেন অভিযোগ করেন না ভুক্তভোগীরা?

অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জা, সময় ও আইনি ঝামেলার ভয়ে অভিযোগ করতে চান না। কেউ মনে করেন, “টাকাটা কম”—এই ভাবনাও প্রতারকদের সুযোগ করে দেয়। ফলে প্রতারণা চলতেই থাকে।
বিয়ের মতো সংবেদনশীল একটি বিষয়কে পুঁজি করে যে প্রতারণা চলছে, তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়—এটি একটি গভীর সামাজিক সংকট। ভুক্তভোগীদের কণ্ঠে উঠে আসা এই গল্পগুলো আমাদের সতর্ক করে দেয়—বিশ্বাসের পাশাপাশি যাচাই জরুরি। নইলে অনলাইন ম্যারেজ মিডিয়ার নামে এই প্রতারণা আরও বিস্তৃত হবে।

Share This Article

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়