চিকিৎসকরাই সত্যিকার অর্থে মানুষের বিপদের বন্ধু: প্রধানমন্ত্রী

ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন

প্রকাশিতঃ বিকাল ০৩:৪০, শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩২
ছবি: সংগৃহীত।

ছবি: সংগৃহীত।

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, চিকিৎসকরাই সত্যিকার অর্থে মানুষের বিপদের বন্ধু। চিকিৎসকের উপদেশ ও আন্তরিক ব্যবহারও একজন রোগীর কাছে ওষুধের মতো কাজ করে। ফলে একজন চিকিৎসকের জন্য পেশাগত উৎকর্ষতার পাশাপাশি মানবিক মানুষ হয়ে ওঠাও জরুরি।

শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার (ইউএইচএফপিও) ঢাকা সম্মেলনে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

যে কোনো পেশার মানুষের চেয়ে চিকিৎসা পেশার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন বাস্তবতায় আজকের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাদের এই সম্মেলন অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়তে চায়। জাতীয় নির্বাচনে আগে আমরা জনগণের কাছে স্বাস্থ্যনীতির রূপরেখা তুলে ধরেছিলাম। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে, প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর ..প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। আমরা যদি রোগের শুরুতেই রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে পারি তাহলে রোগের বিস্তার মোকাবিলা সম্ভব। আমাদের এই নীতি বাস্তবায়নে উপজেলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

তারেক রহমান বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বিশেষায়িত হাসপাতাল অথবা উন্নত ল্যাব প্রায় সবকিছুই শহর কেন্দ্রিক কিংবা আরও সুনির্দিষ্ট করতে বলতে গেলে সবকিছুই রাজধানীকেন্দ্রিক। এমন বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে যদি আমরা জেলা উপজেলাভিত্তিক হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা যেমন জেলা উপজেলায় চিকিৎসা সেবা দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন, অপরদিকে রোগীদেরকেও শারীরিক এবং আর্থিকভাবে আরও কষ্ট করে ঢাকামুখী হতে হবে না। শহর এবং গ্রামাঞ্চলের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

তিনি বলেন, বৈষম্য দূর করে স্বাস্থ্য সেবার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে আমরা ইতোমধ্যেই পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি, যদিও এটি একমাস কিংবা একবছরেই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোট মৃত্যুর ৭১ পার্সেন্ট অসংক্রামক রোগের কারণে হয়ে থাকে। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে উপযুক্ত সচেতনতা সৃষ্টি করার পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে প্রণীত ‘যৌথ ঘোষণা’ বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশগত বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের কারণে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ যেমন শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক, হৃদরোগ ইত্যাদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। এসব কারণে উপজেলা পর্যায়েই গুরুত্বসহকারে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং নিয়মিত করা প্রয়োজন। জীবনযাপনের ধরন পরিবর্তন করার ব্যাপারে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।

আমার কাছে মনে হয়, ভেজাল এবং পুষ্টি সচেতন খাদ্য নিশ্চিত করা শহরের চেয়ে জেলা উপজেলা পর্যায়ে বেশি সহজ। মনে রাখা দরকার, প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মৌলিক ভিত্তি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে ইউএইচএফপিও অর্থাৎ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তারা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। মানসম্মত চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কর্মযজ্ঞে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং সদস্যরা প্রথম সারির যোদ্ধা। হেলথ কেয়ার ম্যানেজমেন্ট এবং হেলথ কেয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্ট’ এর একটি অপরটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।  

একজন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নিজ নিজ কর্মস্থলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার কাজটিও সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে হয়। কারণ, হেলথ কেয়ার ম্যানেজমেন্ট এবং হেলথ কেয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্ট এই দুটি বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় এবং সমউন্নয়ন না হলে স্বাস্থ্য সেবায় কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে, ওষুধ শিল্প, চিকিৎসা সামগ্রী, স্বাস্থ্য সেবা, মডার্ন হেলথ টেকনোলোজি এবং মেডিকেল বায়োটেকনোলজি'র মতো অনেকগুলো দিক রয়েছে। তাই দেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে বিএনপি সরকারের বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

এরই অংশ হিসেবে বর্তমান সরকার ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। 

আমেরিকার একজন বিখ্যাত পুষ্টিবিদ প্রয়াত ‘জ্যাক লালেন’ এর একটি উক্তি উল্লেখ করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আজকের স্বাস্থ্যসেবা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ’। এ কারণেই যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস-এনএইচএস এর জেনারেল প্র্যাকটিশনার-জিপির আদলে প্রতিটি উপজেলা এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করার চিন্তা রয়েছে। এই স্বাস্থ্যসেবা ইউনিটগুলোতে দায়িত্ব পালনের জন্য বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে সারা দেশে ১ লাখ ‘হেলথ কেয়ার’ নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই হেলথ কেয়ারারদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী। হেলথ কেয়াররা মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে জনগণকে প্রাথমিক হেলথ কেয়ার দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন।

উপস্থিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তারা ভবিষ্যতের স্বার্থে যে কোনো মূল্যে আমাদের মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে পরিপূর্ণ মাতৃত্বকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, নবজাতক এবং শিশু স্বাস্থ্যসেবার নিরাপদ স্থানে পরিণত করতে হবে। 

সারা দেশে শিশুদের হামের টিকা না দেওয়ার ফলে বিগত দুই সরকারের ‘জীবনবিনাশী ব্যর্থতা’ ক্ষমাহীন অপরাধ। আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, ভবিষ্যতে আর কখনোই যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। বর্তমান সরকার সারা দেশে জরুরি ভিত্তিতে ‘হামে’র টিকা দিয়ে তড়িৎ ব্যবস্থা নেওয়ায় আল্লাহর রহমতে পরিস্থিতির অবনতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। 

এজন্য আমি সব চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। যারা তাদের প্রিয় সন্তান হারিয়েছেন সেই সব পিতামাতা এবং স্বজনদের কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি। দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে নাগরিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের মনে রাখা দরকার, স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এটি নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের করুনা নয় বরং সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য, সুচিকিৎসা পাওয়া নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। বর্তমানে সরকার শিগগিরই একটি সমন্বিত ই-হেলথ কার্ড চালু করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে। এতে যে কোনো নাগরিক প্রয়োজনে দেশের যে কোনো হাসপাতালে সহজেই চিকিৎসা সেবা গ্রহণের সুযোগ পাবে। এর পাশাপাশি বর্তমান সরকার ধাপে ধাপে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে। যাতে কোনো নাগরিক চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। আমাদের লক্ষ্য হলো, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে আরও উন্নত করা, প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা, এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজ ও কার্যকর করা।

তিনি বলেন, নাগরিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের আবাসন, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি সম্পর্কেও সরকার ওয়াকিবহাল। এ ব্যাপারেও সরকার সাধ্যমতো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে বদ্ধ পরিকর। এই সম্মেলনের মাধ্যমে আমি একটি বার্তা দিতে চাই, সেটি হলো প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজ নিজ এলাকায় একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দেবেন। একটি সুস্থ জাতি গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখি, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আপনারাই মূল কারিগর।

আমরা সবাই মিলে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই যা হবে সবার জন্য সহজলভ্য, কার্যকর এবং মানবিক।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা একটি জবাবদিহিমূলক, টেকসই এবং জনগণকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। আপনাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ এলাকার কর্মস্থলকে একটি মডেল স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে পরিণত করবেন।


 

Share This Article

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়