ইবি,র শহীদ আবরার ফাহাদ হল নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ
আজিজুল ইসলামঃ || বিএমএফ টেলিভিশন
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত ছাত্র হল-১ (শহিদ আবার ফাহাদ হল) এ টেন্ডার শিডিউল উপেক্ষা করে নিম্নমানের সাবমারসিবল পাম্প বসানো হয়েছে। এ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এদিকে অনুমোদনহীন কোনো কাজের বিল হবে না বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ছাত্র হল-১ এর নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইবিএল এম ইসলাম জেভি’ টেন্ডার শিডিউল অনুযায়ী ইউরোপীয় মানের সাবমারসিবল পাম্পের বদলে নিম্নমানের চাইনিজ পাম্প স্থাপন করেছে, যা দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনুমোদনহীন দরজা, হেজবল ও মার্বেল সরবরাহ ও লিফট নিয়ে গড়িমসি অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও গ্লাস-টাইলস স্থাপন, বৈদ্যুতিক ক্যাবলিং, ডাইনিংয়ের কাজ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ বেশ কিছু কাজ এখনো অসম্পূর্ণ।
তবে প্রশাসন ও ঠিকাদারের ভাষ্যমতে, চলতি মাসেই ভবনটি শিক্ষার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হবে
এ বিষয়ে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নুরুল ইসলাম বলেন, সাবমারসিবল পাম্প সচরাচর ইউনিভার্সিটিতে যা লাগিয়েছে আমিও সেটা লাগিয়েছি (চায়নিজ পাম্প)। তবে ইউরোপীয় মানের বিষয়টি যদি দাপ্তরিকভাবে প্রমাণিত হয়, তবে আমি তা পরিবর্তন করে দিতে বাধ্য এবং সে পর্যন্ত কোনো বিলও গ্রহণ করবো না।
ভবনটি প্রশাসনের নিকট হস্তান্তরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে হলের গ্লাস লাগানো, ধোয়া-মোছা এবং লিফট রুমের টাইলসের সামান্য কিছু কাজ বাকি আছে, যা আগামী সাত-আট দিনের মধ্যে শেষ করে এই মাসের মধ্যেই হলটি হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, ৫ বছর ধরে সবকিছুর দাম বাড়ছে। সরকারিভাবে রেট না বাড়লেও চুক্তির দায়বদ্ধতা থেকে আমরা লস দিয়ে হলেও কাজটি সম্পন্ন করছি। একটা লিফটের ওপর তখন ডলার ছিল ৮০ টাকা সেটা হয়ে গেল ১৩০ টাকা। ট্যাক্স ছিল ১২ শতাংশ, সেটি হলো ৫২ শতাংশ। কিন্তু আমি কেন দেবো, আমি তো শিডিউল টেন্ডার নিয়েছি। আমাকে সরকার সাপ্লাই দিচ্ছে কিন্তু রেট তো বেশি দিচ্ছে না।
অন্যদিকে হলের তত্ত্বাবধায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) মো. আব্দুল মালেক বলেন, টেন্ডার সিডিউলে ইউরোপীয় মানের সাবমারসিবল পাম্প লাগানোর কথা থাকলেও ঠিকাদার সেখানে নিম্নমানের চাইনিজ পাম্প বসিয়েছে। এই পাম্প ১ বছরও দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং এগুলো ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যতে নতুন ভবনগুলোতে পানির সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়বে, যার দায়ভার কর্তৃপক্ষের ওপর আসবে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি উপাচার্য, পিডি ও ট্রেজারারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানানো সত্ত্বেও অন্য কারও পরামর্শে পাম্পটি লাগানো হয়েছে
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক প্রকৌশলী (সিভিল) মো. আলীমুজ্জামান টুটুল বলেন, ‘আমরা সাবমারসিবল পাম্পের কোনো অনুমোদন দেইনি। ছাত্ররা উঠলে আপাতত চালানোর জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একটা পাম্প লাগিয়েছে। এটা বিনা অনুমোদনেই লাগানো হয়েছে এবং কোনো বিল পাবে না বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। টেন্ডারের শিডিউল অনুযায়ী যেটা আছে সেটা দিলেই বিল পাবে।
ঠিকাদারের অস্বীকৃতির কথা জানালে তিনি বলেন, সাধারণত ঠিকাদাররা তাদের সুবিধার দিকটাই দেখার চেষ্টা করে। তাছাড়া এই বিষয়টা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দায়িত্বে। ইউরোপীয় মানের কথা যেহেতু উল্লেখ আছে সুতরাং তারা এটা পরিবর্তন করতে বাধ্য।
পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. নওয়াব আলী বলেন, ভিজিলেন্স টিম আমার কাছে লিখিত কোনো নোটিশ দেয়নি। তবে আমার কাছে কিছু রিপোর্ট এসেছে এগুলো নিয়ে আগামী মিটিংয়ে আলোচনা করব। আর ছাত্র হল-১ এর বিষয়ে ঠিকাদারকে চূড়ান্ত একটি নোটিশ এবং নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে দেবো।
এদিকে নবনির্মিত ভবনের ভিজিলেন্স টিমের প্রধান ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদনহীন সাবমারসিবল পাম্প এবং মার্বেল স্থাপন করেছে। অননুমোদিত কাজের জন্য কোনো বিল দেওয়া হবে না। এর আগে তারা নকশাবহির্ভূত ২০০টি দরজা নিয়ে আসলে ভিজিলেন্স টিমের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো অপসারণ করা হয়। লিফট নিয়েও গড়িমসি করে প্রতিষ্ঠানটি। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে ঠিকাদারকে টাকা ধার দিয়ে লিফটের ব্যবস্থা করতে হয়েছে আমাদের।
তিনি আরও বলেন, ভবনটি যত কোটি টাকা টেন্ডার হয়েছে এর মধ্যে যেসব কাজের প্রফিট বেশি সেসবের ১৫ শতাংশ কাজ আওয়ামী লীগ আমলে করেছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এখন ৬ কোটি টাকা চাচ্ছে আমাদের কাছে। টাকা কোথার থেকে দেবো? আগে তো নিয়ে নিয়েছে এবং এই কাজগুলো আমাদের দরকার ছিল না। বর্তমানে কাজের প্রতিটি ধাপ পইপই করে বুঝে নেওয়া হচ্ছে এবং সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করে কাউকে এক পার্সেন্ট বিলও দেওয়া হবে না। ঠিকাদাররা আইনের ঊর্ধ্বে নন।
বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা সম্ভব হয়নি।