ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগে দিরাই থেকে দীঘিনালা, কারাগারে যাওয়ার পর বরখাস্ত: পিআইও মুনির
বিএমএফ টেলিভিশন ডেস্ক || বিএমএফ টেলিভিশন
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মুনির হোসেন খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় কর্মরত থাকা অবস্থায় সাময়িক বরখাস্ত হন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার ঘটনায় গত ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সইয়ে এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়।
অধিদপ্তরের জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে বরখাস্তের আদেশ কার্যকর বলে গণ্য হবে। শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার ঘটনাই নয়, পিআইও মো. মুনির হোসেনের বিরুদ্ধে আরও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির লিখিত অভিযোগ করেন রাজানগর ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হিরন মালা বেগম। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
জানা গেছে, ঘুষ, দুর্নীতি ও অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগে তাঁকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা মামলায় কারাগারে যাওয়ার পর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্তের অফিস আদেশে বলা হয়েছে, চাঁদপুরের কচুয়া থানাসংশ্লিষ্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(গ)/৩০ ধারায় করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার হন মুনির হোসেন। পরে তাঁকে ২০২৬ সালের ২২ জুলাই চাঁদপুর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
চাঁদপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের স্মারক অনুযায়ী, ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে তিনি জামিনে মুক্তি পান। বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের সংশ্লিষ্ট বিধি অনুসারে, গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি প্রচলিত বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন।
মো. মুনির হোসেন পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম আবদুল খালেক।
এদিকে, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মুনির হোসেন ৭৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন বলে অভিযোগ করেছেন ৩ নম্বর রাজানগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হিরন মালা বেগম। টাকা নেওয়ার পরও কাজ না দেওয়ায় তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনজীব সরকারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগপত্রে হিরন মালা বেগম উল্লেখ করেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মুনির হোসেন তাঁকে প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ৭৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে বাধ্য হয়ে তিনি তাঁকে ওই টাকা দেন। তবে টাকা নেওয়ার পরও তাঁকে কোনো প্রকল্পের কাজ দেওয়া হয়নি।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, টাকা দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণের জন্য তাঁর কাছে তিনজন সাক্ষী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর স্বামী মো. ফুল মিয়া, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর পিকলো তনুকদার এবং শান্ত দাস। তাঁদের উপস্থিতিতে নগদ ৭৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ৯ জুলাই তিনি এ অভিযোগ দায়ের করেন। জানা গেছে, পরবর্তী সময়ে ওই নারী ইউপি সদস্যকে নানাভাবে ম্যানেজও করেছিলেন মুনির হোসেন।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনজীব সরকার ইউপি সদস্য হিরন মালা বেগমের অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তাঁদের শুনানির জন্য ডাকা হয়েছিল। পরে হিরন মালা বেগম জানান, তাঁদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছিল এবং তা সমাধানও হয়েছে।
দিরাই উপজেলায় কর্মরত থাকাকালে মুনির হোসেনের বিরুদ্ধে আরও কী ধরনের অভিযোগ ছিল, জানতে চাইলে ইউএনও সনজীব সরকার বলেন, তাঁর একাধিক স্ত্রী ছিলেন। এসব বিষয় নিয়ে পারিবারিক ঝামেলা ছিল। এ ছাড়া অন্য কিছু তাঁর এখন আর স্মরণে নেই।
দুদকের চেয়ারম্যান ও মহাপরিচালক (প্রশাসন) বরাবর দেওয়া অভিযোগে দিরাই উপজেলার সর্বস্তরের জনগণের পক্ষে দাবি করা হয়, পিআইও হিসেবে যোগদানের পর থেকেই মুনির হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কাছ থেকে প্রকল্পের বিল ছাড়ের সময় প্রতি লাখ টাকায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা কমিশন নিতেন তিনি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির (কাবিখা) বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকল্পে প্রকল্প সভাপতি মনোনয়নেও অনিয়ম করা হয়েছে। বিশেষ করে ৩ নম্বর রাজানগর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের বাদ দিয়ে পিআইওর পছন্দের ব্যক্তিদের প্রকল্প সভাপতি করার অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো প্রকল্প কমিটিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর না নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সাল থেকে তাঁর প্রথম স্ত্রীর নামে এবং আরও কয়েকটি ব্যাংক হিসাবে দিরাই উপজেলার বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ থেকে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পাঠানোর অভিযোগ করা হয়েছে। এ দাবির সমর্থনে ব্যাংকের রসিদ সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
মুনির হোসেন বরখাস্ত হওয়ার সময় খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন তানজিল পারভেজ। তিনি বর্তমানে মাদারীপুর জেলার ডাসার উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা। তাঁর সরকারি ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি।
এ বিষয়ে দীঘিনালা উপজেলার বর্তমান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মাত্র এক সপ্তাহ আগে তিনি এ উপজেলায় যোগদান করেছেন। এ কারণে বিষয়টি সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কমিউনিকেশন মিডিয়া স্পেশালিস্ট সৈয়দ আশরাফ উল ইসলামের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি সাময়িক বরখাস্ত হওয়া পিআইও মো. মুনির হোসেন সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন-১) তাসনূভা নাশতারান (উপসচিব) জানান, মো. মুনির হোসেন এখনো বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন। এ ছাড়া নতুন কোনো তথ্য নেই।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. মুনির হোসেনের বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যক্তিগত একাধিক মোবাইল ফোন নম্বরে কল করা হলেও সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।