ডিভাইস আসক্তি কেড়ে নিচ্ছে নামাজের মনোযোগ!

ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন

প্রকাশিতঃ বিকাল ০৫:৫৪, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
ছবি: সংগৃহীত।

ছবি: সংগৃহীত।

প্রযুক্তি আজ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। কিন্তু যে প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে, সেই প্রযুক্তিই নীরবে আমাদের হৃদয়ের সবচেয়ে মূল্যবান ইবাদত নামাজের একাগ্রতা কেড়ে নিচ্ছে।

আমাদের মধ্যে অনেকেই নামাজে দাঁড়িয়েও কাজের চিন্তা, মেসেজ, নোটিফিকেশন, ফেসবুক, ভিডিও বা ফোনকলের কথা ভাবতে থাকেন। নামাজে দাঁড়ানোর পর মনে আসে, আমাকে কেউ ফোন দিচ্ছে কি না বা কেউ আমাকে মেসেজ দিচ্ছে কি না, অথবা নামাজ শেষ করেই দ্রুত কাউকে মেসেজ দিতে হবে। বারবার চেষ্টা করেও আমরা নামাজে মনোযোগ বসাতে পারি না, নামাজের মধ্যে একাগ্রতা সৃষ্টি করতে পারি না। এখন আমরা দুই রাকাত নামাজও পূর্ণ মনোযোগ সহকারে আদায় করতে পারি না।

ফলে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু আমাদের শরীর; অথচ মন ঘুরে বেড়ায় কর্মস্থলে, মোবাইলের পর্দায়, অপঠিত বার্তায় কিংবা দুনিয়ার অগণিত ব্যস্ততায়। আমরা আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েও যেন দুনিয়ার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকি। তাই নামাজ আদায় করা হলেও তার প্রকৃত স্বাদ ও খুশু (একাগ্রতা) হারিয়ে যায়।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সফল মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে, যারা তাদের সালাতে বিনয়ী ও একাগ্র।

’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১-২)

এই আয়াত স্পষ্ট করে যে শুধু নামাজ পড়াই যথেষ্ট নয়; বরং নামাজে মনোযোগ ও বিনয় অর্জন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন, ‘ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। আর এটি অবশ্যই কঠিন, তবে খুশুসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নয়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৪৫)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেছেন, যে নামাজে পরিপূর্ণ মনোযোগ থাকে না, সে নামাজ আদায় হলেও তার প্রকৃত স্বাদ থাকে না এবং পরিপূর্ণ সওয়াবও পাওয়া যায় না।

(মাআরিফুল কুরআন : ১/২২১)

নামাজের মর্যাদা অনেকাংশেই নির্ভর করে আমাদের উপস্থিত হৃদয়ের ওপর, আমাদের মনোযোগের ওপর।

এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দা নামাজ আদায় করে, অথচ তার জন্য কখনো ১০ ভাগের এক ভাগ, কখনো ৯ ভাগের এক ভাগ, কখনো আট ভাগের এক ভাগ—এভাবে যতটুকু মনোযোগ ছিল, ততটুকুই সওয়াব লেখা হয়।

(আবু দাউদ, হাদিস : ৭৯৬)

অন্য একটা হাদিস এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যতক্ষণ বান্দা সালাতে এদিক-সেদিক না তাকায়, ততক্ষণ আল্লাহ তার দিকে মনোযোগ রাখেন। আর যখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আল্লাহও তার থেকে মনোযোগ ফিরিয়ে নেন।’

(তিরমিজি, হাদিস : ২৮৬৩)

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি আমাদের মনকে সব সময় ব্যস্ত রাখে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, বারবার স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন মানুষের মনোযোগ ভেঙে দেয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে গভীরভাবে কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন করে তোলে। এই অভ্যাস নামাজেও প্রভাব ফেলে। নামাজের আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটানোর পর হঠাৎ সম্পূর্ণ মনোযোগ নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো সহজ হয় না।

অনেকেই নামাজ শুরু করার আগমুহূর্ত পর্যন্ত ফোন ব্যবহার করেন। আবার আরো ফোন সাইলেন্ট না থাকায় নামাজের মাঝেই রিংটোন বা নোটিফিকেশনের শব্দে মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের আগে এমন সব বিষয় দূরে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, যা মনোযোগ নষ্ট করে। তিনি বলেছেন, যখন খাবার উপস্থিত থাকে এবং পেশাব-পায়খানার চাপ থাকে, তখন নামাজ নয়। (মুসলিম, হাদিস : ৫৬০)

এ থেকে বোঝা যায়, মনোযোগ নষ্ট করে এমন বিষয় থেকে নিজেকে মুক্ত করে নামাজে দাঁড়ানো উচিত।

তাই সম্ভব হলে নামাজের সময় মোবাইল দূরে রাখা, অন্তত কয়েক মিনিট আগে ফোন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, রিংটোন ও নোটিফিকেশন বন্ধ করা এবং অজুর সময় থেকেই আল্লাহর স্মরণে মনকে প্রস্তুত করা—এসব ছোট অভ্যাস একাগ্রতা অর্জনে সহায়ক। পাশাপাশি তিলাওয়াতের অর্থ বোঝার চেষ্টা, সিজদার স্থানে দৃষ্টি রাখা।

আজানের ধ্বনি শোনা মাত্রই দুনিয়ার সব ব্যস্ততা পেছনে ফেলে এমনভাবে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো উচিত, যেন এটাই জীবনের শেষ সালাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এমনভাবে সালাত আদায় করো, যেন এটি তোমার জীবনের শেষ সালাত।’

(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৭১)

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিটি সালাত হৃদয়ের প্রশান্তি, ঈমানের শক্তি ও আখিরাতের সফলতার পাথেয় হিসেবে কবুল করুন। আমিন।


 


 

Share This Article

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়