কালের সাক্ষী: স্বস্তিপুর শাহী মসজিদ…
বিএমএফ টেলিভিশন ডেস্ক || বিএমএফ টেলিভিশন
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আলামপুর ইউনিয়নে অবস্থিত স্বস্তিপুর একটি ঐতিহাসিক জনপদ। এই জনপদের প্রাচীন শাহী মসজিদের ইতিহাস যেন আমাদের নিয়ে যায় সাড়ে তিন’শ বছর আগের মুঘল আমলের এক রোমাঞ্চকর লোককথার অদ্ভুত মেলবন্ধনে!
এক রাতে জ্বীনেরা বানিয়েছিল এই মসজিদ?
স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে যুগ যুগ ধরে একটি লোককথা প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, এক রাতে অলৌকিক ও গায়েবি মদদে জ্বীনেরা এই সুদৃশ্য মসজিদটি নির্মাণ করে দিয়ে গেছে। মুঘল আমলের অবসানের পর একপর্যায়ে এই অঞ্চলটি গভীর জঙ্গলে ঢাকা পড়ে যায়। দীর্ঘদিন পর এ অঞ্চলে আবার লোকবসতি গড়ে উঠতে থাকে। ঝোপ-জঙ্গল কাটার পর হঠাৎ করেই অক্ষত অবস্থায় মুঘল স্থাপত্যের এই কীর্তিটি মানুষের চোখে পড়ে। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই হঠাৎ আবিষ্কারের ফলেই সাধারণ মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মে যে এটি কোনো মানুষের নয়, বরং জ্বীনের হাতের কাজ। আর এ কারণেই এটি স্থানীয়ভাবে ‘গায়েবি শাহী মসজিদ’ নামেও পরিচিতি পায়!
কীভাবে এলো ‘স্বস্তিপুর’ নাম?
বাস্তব ইতিহাস অনুযায়ী, মুঘল আমলে বাংলার সুবেদার নবাব শায়েস্তা খানের নামানুসারে এই গ্রামের প্রশাসনিক নাম রাখা হয়েছিল ‘শায়েস্তাপুর’। এই গ্রামের পাশ দিয়েই চলে গিয়েছিল তৎকালীন রাজকীয় স্থলপথ বা মহাসড়ক—‘শাহী সড়ক’ (যা পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর থেকে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা হয়ে ফরিদপুরের ভেতর দিয়ে ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল)। একই সাথে এই স্থলপথের সমান্তরালে গড়াই নদীর শাখা ‘হলু নদী’র একটি নৌপথও সচল ছিল, যা ব্যবহার করে কলকাতা থেকে ফরিদপুর হয়ে সরাসরি ঢাকা যাতায়াত করা যেত। কলকাতা কিংবা কৃষ্ণনগর থেকে স্থল বা জলপথের এই দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া ছিল অত্যন্ত ক্লান্তিকর। ইতিহাসবিদদের মতে, দীর্ঘ পথ শেষে এই গ্রামে এসে পৌঁছালে পথিক, ব্যবসায়ী ও রাজকীয় সেনারা নিরাপদ আশ্রয় পেত এবং মনে এক পরম ‘স্বস্তি’ ফিরে পেত। কালক্রমে এই ‘স্বস্তি’ পাওয়ার অনুভূতি এবং আদি নাম ‘শায়েস্তাপুর’—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে মানুষের মুখে মুখে গ্রামটির নাম স্থায়ীভাবে রূপ নেয় আজকের ‘স্বস্তিপুর’-এ।
মসজিদ ও শাহী ফৌজের ইতিহাস:
ইতিহাস ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে ধারণা করা যায়, সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে সুবেদার নবাব শায়েস্তা খান তাঁর প্রথম দফার শাসনকালে (আনুমানিক ১৬৬৪ থেকে ১৬৭২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে) এই ঐতিহাসিক মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন।
শাহী সড়ক (স্থলপথ) কিংবা সমান্তরাল নৌপথে যাতায়াতকালে মুঘল সাম্রাজ্যের ‘শাহী ফৌজ’ বা রাজকীয় সৈন্যরা পথিমধ্যে এই স্বস্তিপুর গ্রামে যাত্রাবিরতি করত। তাদের বিশ্রাম এবং নামাজ আদায়ের সুবিধার্থেই এই রাজকীয় তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি ঠিক শাহী সড়কের পাশে নির্মাণ করা হয়েছিল।
ইতিহাস আর রূপকথার সাক্ষী এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি আমাদের আলামপুর ইউনিয়নের এক অনন্য গর্ব!