স্বপ্ন যখন শিল্পে রূপ নেয়
আলহাজ্ব মো. মজিবর রহমান (মজনু সাহেব): এক স্বপ্নবাজের অসাধারণ অভিযাত্রা
বিশেষ প্রতিনিধি | || বিএমএফ টেলিভিশন
সব মানুষ একই রকম নন। কেউ জীবন কাটান শুধু নিজের জন্য, আবার কেউ নিজের জীবনকে এমনভাবে গড়ে তোলেন, যা হাজারো মানুষের জীবন বদলে দেয়। আলহাজ্ব মো. মজিবর রহমান (মজনু সাহেব) সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় সংগ্রাম, সাহস, সততা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য দলিল।
১৯৪৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির শৈশব ছিল অভাব-অনটনে ভরা। কিন্তু তিনি কখনো দারিদ্র্যকে নিজের ভাগ্য হিসেবে মেনে নেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন—মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, তার সততা, পরিশ্রম এবং স্বপ্ন দেখার সাহস।
মাত্র ৭০০ টাকা পকেটে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমানো সেই তরুণ জানতেন না সামনে কী অপেক্ষা করছে। ছিল না কোনো প্রভাবশালী পরিচয়, ছিল না কোনো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ব্যবসা। ছিল শুধু একটি অদম্য বিশ্বাস—একদিন সফল হতেই হবে।
জীবনের কঠিনতম সময়ে নিজের সন্তানের জন্য এক গ্লাস দুধ কেনার সামর্থ্যও ছিল না। অর্থ সাশ্রয়ের জন্য একটি সিগারেট তিনবারে খেতে হয়েছে। কিন্তু এসব কষ্ট তাঁকে কখনো থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধাই তাঁকে আরও শক্তিশালী করেছে।
১৯৭৮ সালে কুষ্টিয়ার কুমারগাড়া বিসিক শিল্পনগরীতে মাত্র ৫ হাজার টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন বিআরবি ক্যাবলস। ছোট্ট একটি উদ্যোগ থেকেই শুরু হয় এক বিশাল স্বপ্নের যাত্রা। আজ সেই স্বপ্নই বিআরবি গ্রুপকে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত করেছে।
বর্তমানে বিআরবি গ্রুপ শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি হাজারো পরিবারের জীবিকার উৎস, অসংখ্য তরুণের কর্মসংস্থানের ঠিকানা এবং কুষ্টিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠানটি দেশের শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিআরবির পণ্য আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে গেছে। ব্রিটেন, জার্মানি, জাপানসহ বহু দেশে “Made in Bangladesh” লেখা বিআরবির পণ্য বাংলাদেশের শিল্প সক্ষমতার উজ্জ্বল প্রতীক।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিকবার সিআইপি সম্মাননা, রাষ্ট্রপতির শিল্প উন্নয়ন পুরস্কার এবং জাতীয় রপ্তানি ট্রফি অর্জন করেছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় পুরস্কারে নয়—তিনি একজন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী, একজন সমাজগড়ার কারিগর।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বিদ্যালয়, বিজ্ঞান ভবন, আধুনিক অডিটোরিয়াম এবং হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রকৃত শিল্পপতি শুধু ব্যবসা করেন না; তিনি ভবিষ্যৎও নির্মাণ করেন।
আজকের তরুণদের জন্য তাঁর জীবন এক অনন্য অনুপ্রেরণা। তিনি দেখিয়েছেন, সফলতার কোনো শর্টকাট নেই। কঠোর পরিশ্রম, সততা, শৃঙ্খলা এবং ধৈর্যই মানুষের প্রকৃত শক্তি।
সময় বদলাবে, প্রজন্ম বদলাবে, নতুন নতুন উদ্যোক্তা আসবেন। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে আলহাজ্ব মো. মজিবর রহমান (মজনু সাহেব)-এর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, সংগ্রামী এবং দেশপ্রেমিক শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে।
কারণ কিছু মানুষ শুধু নিজেদের জন্য সফল হন না—তাঁরা একটি জাতির সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেন। আলহাজ্ব মো. মজিবর রহমান (মজনু সাহেব) তেমনই একজন, যাঁর জীবন আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।