চোখ এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে
ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন
সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বড় পরিকল্পনা। প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট, ব্যয়বহুল জ্বালানি তেল ও এলএনজি-কয়লার আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চোখ শুধু এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে যেভাবেই হোক নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে এজন্য দ্রুত কাজ এগিয়ে নিচ্ছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে ৭৩টি প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী চার বছরে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। সরকারি খাস জমি ছাড়াও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি কিনে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বাতিলকৃত ৩১ প্রকল্পের কাজও দ্রুত শুরু হতে যাচ্ছে। এ ছাড়া দেশের ১০টি স্থানে নতুন করে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য সম্প্রতি দরপত্র আহ্বান করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ বিভাগের নবায়নযোগ্য জ্বালানি অনুবিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, অন্তর্বর্তী সরকার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যে ৩১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছিল সেগুলো আবার চালু করা হচ্ছে। বর্তমানে তেল, কয়লা ও এলএনজির ব্যবহার ব্যয়বহুল। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতও ক্রমে ফুরিয়ে আসছে। জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত মূল্যের জন্য বাংলাদেশের মতো দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছাড়া অন্য বিকল্প নেই।
ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বাংলাদেশ থেকে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। এখন অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ করার জন্য বর্তমান সরকারের একটিই অবস্থান আর সেটি হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে সমৃদ্ধ করা। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ তুলনামূলক কম। একই সঙ্গে বায়ুবিদ্যুৎকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী চার বছরের মধ্যে নবায়নযোগ্য খাত থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় নতুন করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে উদ্যোক্তাদের কাছে সরকার উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এই উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে সৌরবিদ্যুৎ কিনবে। ৭৩টি প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ৫ হাজার ৩৯০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এর মধ্যে বর্তমানে ১৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৬৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এর প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ১৫ টাকা ৮৩ পয়সা।
এর বাইরে ১১টি প্রকল্পের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও বাস্তবায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যা ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু এর কমার্শিয়াল অপারেশন ডেট (সিওডি) এখনো পাওয়া যায়নি। এই ১১টি প্রকল্প থেকে ৩৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। এগুলোর অবকাঠামো নির্মাণকাজ শেষ।
এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালুর অপেক্ষায় আছে। এই প্রকল্পের কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য জনবল নিয়োগসহ বেশ কিছু কাজ শেষ না হওয়ায় মন্ত্রণালয়ে উৎপাদন তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত এই প্রকল্পগুলো উৎপাদনে আসবে। এই ১১ প্রকল্পে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ১৫ টাকা ৬৭ পয়সা।
এরই মধ্যে আগে দরপত্র আহ্বান করা ৫৫টি প্রকল্পের মধ্যে ১২টি প্রকল্পে নোটিস অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) ইস্যু করা হয়েছে। এই ১২টি প্রকল্প থেকে ৯১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে। যার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ৯ টাকা ৪৯ পয়সা।
এ ছাড়া এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বাতিলকৃত ৩১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই প্রকল্পগুলো থেকে আসবে মোট ৩ হাজার ৫৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এই প্রকল্পগুলোর প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ১২ টাকা ২৬ পয়সা। এই প্রকল্পগুলো দ্রুত চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রকল্প চালু করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্ট হাতে আসা মাত্রই প্রকল্প চালুর জন্য শিগগিরই বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্প কর্মকর্তাদের অনুমতিপত্র দেওয়া হবে।
এ ছাড়া গত মাসের ২৭ তারিখে দেশের ১০টি স্থানে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করেছে। জুনের ২৫ তারিখ পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়া যাবে। এই উদ্যোগে বাজিতপুরে ২৫ মেগাওয়াট, লোহাগড়ায় ৩০ মোগাওয়াট, কুড়িগ্রামে ৪৫ মেগাওয়াট, ভালুকায় ৪৫ মেগাওয়াট, কক্সবাজারে ৫০ মেগাওয়াট করে ২টি, পঞ্চগড়ে ৫০ মেগাওয়াট, লালমনিরহাটে ৫০ মেগাওয়াট, নেত্রোকোনায় ৫০ মেগাওয়াট এবং টাঙ্গাইলে ১০০ মেগাওয়াট করে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো স্থাপন করা হবে।
জানা যায়, বায়ুবিদ্যুতে অগ্রগতি কম হলেও বর্জ্য থেকে গাবতলীর আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এখন আলোচনা চলছে। আর সোলার রুফটপ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ চলছে।
আগের ৫৫টি টেন্ডারকৃত প্রকল্পের মধ্যে নোটিস অব অ্যাওয়ার্ড ইস্যুকৃত ১২ প্রকল্পের উদ্যোক্তারাই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জমির ব্যবস্থা করছে। এই জমিগুলো গ্রিডের কাছেই নেওয়া হয়েছে। এগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি। আর সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে সরকারি খাস জমি ব্যবহৃত হবে তার জন্য বিনিয়োগ বোর্ড থেকে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে নতুন নীতিমালা তৈরি হয়েছে। এতে সরকারি খাস জমিগুলো উদ্যোক্তারা খুঁজে দেবে। এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির তুলনায় খাস জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কিছুটা কঠিন। ব্যক্তি জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রমও দ্রুত হচ্ছে।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চায়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার পর নবায়নযোগ্য জ্বালানির কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩ দশমিক ৫ একরের বেশি আয়তনের যেসব জমি বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে না সেখানে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। ঢাকায় বিদ্যুতের লোড কমাতে প্রতি বাসায় সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী জুনে সরকারি আদেশ জারির মাধ্যমে এ বিষয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। সরকার আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ সহজ করতে নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে।
ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ভিসি এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ মুহূর্তে আমাদের নিজস্ব জ্বালানি হিসেবে দ্রুত কোনো জ্বালানির কথা ভাবলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা ভাবতে হবে। সরকারি খাস জমি বা অধিগ্রহণকৃত জমি যা কোনো কাজে ব্যবহার হয় না সেখানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এ খাতে যদি সঠিক বিনিয়োগ করা যায় এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে চার থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা যাবে।