জনগণ হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন

প্রকাশিতঃ বিকাল ০৪:১৪, সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩২
ছবি: সংগৃহীত।

ছবি: সংগৃহীত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির পর দেশে জনগণের সরাসরি ভোটে দায়বদ্ধ ও জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণ তাদের হারানো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পেয়েছে।

তিনি বলেন, আর কখনো যাতে কোনো স্বৈরাচার কিংবা তাবেদার গোষ্ঠী জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে।

সোমবার (২০ এপ্রিল) সকাল ১১টায় বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ই-বেইলবন্ড সিস্টেমের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।

এর মধ্য দিয়ে বগুড়াসহ সাত জেলায় এ ই-বেইলবন্ড সিস্টেম চালু হলো। একই সঙ্গে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আইনজীবী সমিতির নবনির্মিত ভবনও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ—এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় করে দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের সুফল মিলবে না। সামাজিক ভারসাম্য, সমতা এবং অধিকার নিশ্চিত করতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম উপাদান, যা মূলত নৈতিকতা, আইন এবং মানুষের প্রাপ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি মৌলিক দিক।

স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছিলেন—এ কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারকদের ভূমিকাই মুখ্য। এ কারণে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে হরণ করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিচার বিভাগকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছিল।

আইনের দোহাই দিয়ে শাসন চালালেও তখন দেশে ‘ন্যায়বিচার’ ছিল না বলে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষ অন্ধকারের শাসন থেকে মুক্তি পায়। সুতরাং, বর্তমান সরকার দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।

তিনি বলেন, আদালত হয়রানির জায়গা নয়, বরং ন্যায়বিচার পাওয়ার নিরাপদ স্থান—জনমনে এমন বিশ্বাস দৃঢ় হলে সমাজ থেকে ‘মব ভায়োলেন্স’ও দূর হয়ে যাবে। এ জন্য বর্তমান সরকার বিচার বিভাগকে ‘ন্যায় ও আস্থার’ জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ায় জনগণের হয়রানি লাঘব করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে বিচার, প্রশাসন ও বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের অংশ হিসেবে বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নে ‘ই-বেইলবন্ড’ পদ্ধতি বাস্তবায়ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হয়েছে। দেশের সব আদালতে এ পদ্ধতি চালু করা গেলে বিচারপ্রাপ্তিতে বিলম্ব ও বৈষম্য দূর করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার—বিষয় দুটি একে অপরের পরিপূরক। তবে রাষ্ট্রে কেবল আইনের শাসনই শেষ কথা নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র ও সমাজে আইনানুগ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক। আমি মনে করি, জামিন প্রক্রিয়ায় ই-বেইলবন্ড ব্যবস্থা বিচারপ্রার্থীদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ।

‘ইলেকট্রনিক জামিননামা’ বা ই-বেইলবন্ড পদ্ধতির মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই জামিননামা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যাওয়ায় বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি কমছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আগে একটি জামিননামা সম্পন্ন করতে আদালত থেকে জেলখানায় পৌঁছানো পর্যন্ত আইনজীবী, মুহুরি, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, পিয়নসহ বিভিন্ন ধাপে অন্তত ১৩টি প্রক্রিয়া পার হতে হতো। ‘ই-বেইলবন্ড’ পদ্ধতি চালুর পর এখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে জামিননামা খুব অল্প সময়েই পৌঁছে যাচ্ছে। এ কারণে সরকার সারাদেশের সব আদালতকে এ পদ্ধতির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এরই অংশ হিসেবে আজ থেকে বগুড়া, ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়া—এই জেলাগুলোতে আদালতের কার্যক্রমে ‘ই-বেইলবন্ড’ পদ্ধতি চালু হলো। এর ফলে জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তির কারামুক্তির ক্ষেত্রে হয়রানি কমবে। পাশাপাশি বিরোধীপক্ষ বা মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা এবং জামিননামা জালিয়াতির সুযোগও হ্রাস পাবে।

তিনি বলেন, একজন বিচারক যেহেতু জামিন আদেশ যাচাই করে সরাসরি অনলাইনে কারা প্রশাসনের কাছে পাঠাবেন, সেহেতু কারা প্রশাসন তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মুক্তি দিতে সক্ষম হবে।

ফলে ই-বেইলবন্ড বা ইলেকট্রনিক জামিননামা ব্যবস্থা বিচার ব্যবস্থায় জনগণের অযথা হয়রানি ও দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে।

তিনি বলেন, ই-বেইলবন্ড সিস্টেমকে পুলিশের সিডিএমএস, আদালতের কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইকরণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।

জনদুর্ভোগ কমাতে বিচার ব্যবস্থার পুরো প্রক্রিয়াকে কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের আওতায় এনে আধুনিকায়নের উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হবে।

তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার বিচার ব্যবস্থায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট, রিলিজ অর্ডার এবং থানা থেকে ওয়ারেন্ট রিকলের কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে এক জেলার আসামি অন্য জেলায় গ্রেপ্তার হলে অনলাইনে দ্রুত ‘উপনথি’ পাঠিয়ে জামিন শুনানি সহজ করা যাবে। ফলে পুলিশি হয়রানি ও ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আটক রাখার অপসংস্কৃতি দূর করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, মানসিকতারও উন্নয়ন প্রয়োজন। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে বিচার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা একজন সাধারণ নাগরিকের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। বিচার বিভাগ হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় ভিত্তি। আমি বিশ্বাস করি, ‘এক্সেস টু জাস্টিস ফর অল’। ন্যায়বিচার কোনো দয়া বা করুণার বিষয় নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই ডিজিটাল উদ্যোগ সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় মাইলফলক। তিনি আইন মন্ত্রণালয়, কারা কর্তৃপক্ষ এবং এ সিস্টেম বাস্তবায়নে যুক্ত সকল আইটি বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি আইনজীবী ও বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন এ প্রযুক্তি গ্রহণ করে বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

এদিকে, জেলখানায় অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষ অকারণে বা আর্থিক সংকটে আইনজীবী নিয়োগ করতে না পেরে বছরের পর বছর বিনাবিচারে কারাভোগ করছেন উল্লেখ করে এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে আইনমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন তিনি।


 

Share This Article

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়