ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ভূমধ্যসাগরে ২২ জনের মৃত্যু, ১০ জনই সুনামগঞ্জের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। || বিএমএফ টেলিভিশন

প্রকাশিতঃ সকাল ১০:৪৩, রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২
ছবি: সংগৃহীত।

ছবি: সংগৃহীত।

সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে গ্রিসের উপকূলে নৌকায় অন্তত ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই বাংলাদেশ ও সুদানের নাগরিক। খবর গার্ডিয়ানের। গত শুক্রবার গ্রিসের বৃহত্তম দ্বীপ ক্রিটের অদূরে এ ঘটনা ঘটলেও তা গতকাল শনিবার বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারেন নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের স্বজন।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ছয় দিন সাগরে ভেসে থাকার পর প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ওই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৃত্যু হয়। তারা উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া থেকে রাবারের একটি নৌকায় চড়ে সমুদ্রপথে ইউরোপ যাচ্ছিলেন। ওই যাত্রা থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা গতকাল শনিবার গ্রিসের কোস্টগার্ডকে এ তথ্য জানিয়েছেন। ওই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে ২১ জন বাংলাদেশি, ৪ জন দক্ষিণ সুদানি এবং শাদের একজন নাগরিক জীবিত উদ্ধার হয়েছেন।

গ্রিসের কোস্টগার্ড জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত ও উপকূলীয় রক্ষা বাহিনী ফ্রন্টেক্সের একটি জাহাজ গ্রিসের বৃহত্তম এবং ভূমধ্যসাগরের পঞ্চম বৃহত্তম দ্বীপ ক্রিটের কাছ থেকে ২৬ জনকে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে এক নারী ও এক শিশুও রয়েছে।

উদ্ধার হওয়ারা জানান, যাত্রাপথে মারা যাওয়াদের লাশ পাচারকারীদের নির্দেশে ভূমধ্যসাগরে ফেলে দেওয়া হয়।

গ্রিসের কোস্টগার্ড জানায়, নৌকাটি গত ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়। ছয় দিন ধরে খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকায় যাত্রীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। প্রতিকূল আবহাওয়া, খাদ্য ও পানির সংকটে সবমিলিয়ে ২২ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দক্ষিণ সুদানের দুই পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে দেশটিতে প্রবেশ ও অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে তদন্ত চলছে।

মৃতদের মধ্যে ১০ জন সুনামগঞ্জের বলে তথ্য স্বজনদের: সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে মারা যাওয়া ২২ জনের মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জের বলে জানিয়েছেন তাদের স্বজনরা। দালালের প্ররোচণায় ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে তারা ইউরোপযাত্রায় শামিল হয়েছিলেন। এই ১০ যুবক পরিবারে সচ্ছলতা আনতে জমিজমা বিক্রি করে এমন ‘মৃত্যুযাত্রা’র পথে পা বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু

স্বপ্নের দেশে পৌঁছার আগেই সাগরে তাদের সলিল সমাধি হলো। এই খবরে মুষড়ে পড়েছেন পরিবারের লোকজন। কান্নায় ভেঙে পড়ে দালালের বিচারের দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতদের স্বজনরা।

নিহতদের স্বজন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং থানা ও জেলা পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই ১০ জনের মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ জন, দিরাইয়ের ৪ জন এবং দোয়ারাবাজারের ১ জন মারা গেছেন। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গতকাল রাত ১টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারে, পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে।

স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জগন্নাথপুরের নিহতরা হলেন পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (৩৫), টিয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়ক মিয়া (২০), ইছগাঁও গ্রামের মো. আলী, বাউরি গ্রামের মো. সোহানুর রহমান এবং জগন্নাথপুর পৌরসভার কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম। তারা দালালকে ১১-১২ লাখ টাকা দিয়ে অবৈধভাবে গ্রিস যেতে চেয়েছিলেন। দালালদের হাতে পুরো টাকা জমাও দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ক্ষুধায় ও পানির অভাবে মৃত্যুবরণ করলেন। হতভাগ্য এসব যুবকের কেউ তিন মাস আগে কেউ চার মাস আগে লিবিয়া গিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, দিরাই উপজেলার নিহতরা হলেন কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), মৃত কারি ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান এহিয়া (২২), আব্দুল গণির ছেলে মো. সাজিদুর রহমান (২৬) এবং রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৪০)। মৃত্যুর পর তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

একই ঘটনায় দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের ফাহিম নামের আরেক যুবকেরও নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

জগন্নাথপুরের চিলাউড়া গ্রামের বাসিন্দা ঝিনুক মিয়া একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার ভাই নাঈমকে নিয়ে গিয়ে সাগরে নৌকায় তুলে দিয়েছিল দালালের লোকজন। আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না কয়েকদিন ধরে। আজ (গতকাল)শুনেছি সে সাগরে মারা গেছে। আমরা দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি।’

জগন্নাথপুরের চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, ‘আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি আমার ইউনিয়নের নাঈম আহমদ ও মনির মিয়া নামের দুই যুবক সাগরে মারা গেছে। তারা গ্রিসে যেতে দালালকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছিল। এখন পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে পড়ল।’

নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, তারাপাশা গ্রামের ওয়াকিব মিয়ার ছেলে মুজিবুর রহমান নামে এক মানব পাচারকারীর সঙ্গে জনপ্রতি প্রায় ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করে নিহত ১০ যুবক লিবিয়া হয়ে গ্রিসের পথে পা বাড়িয়েছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী বড় ও নিরাপদ নৌযানে পাঠানোর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ছোট্ট ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় তুলে দেওয়া হয়।

স্থানীয় সাংবাদিক উমেদ আলী বলেন, তার ভাগ্নে নুরুজ্জামান সরদার ময়না এ ঘটনায় মারা গেছেন। একই নৌকায় থাকা জীবিত উদ্ধার হওয়া রোহান আহমেদ জানিয়েছেন, তার চোখের সামনেই বাংলাদেশিসহ অনেকের মৃত্যু হয়। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জিব সরকার বলেন, নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করেননি। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের খবর পাওয়া গেলেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পরিদর্শক (ডিআইও-১) মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি দিরাই ও জগন্নাথপুরে ৮ জন মারা গেছেন। তবে লোকজন আরও দুজন মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন। আমরা খোঁজখবর নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছি।’

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার জানান, ভূমধ্যসাগরে নিহত বাংলাদেশির মধ্যে দিরাইয়েরও চারজন থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।

চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভূমধ্যসাগরে ৫৫৯ জন মারা গেছেন, যেখানে গত বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২৮৭।

 


 

Share This Article

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়