হাম রোগ কী ও কেন হয়, প্রতিকারের উপায়
ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন
Measles (হাম) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন হাম রোগী গড়ে ১২–১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন (R₀ 12–18)—এ কারণে একে “অত্যন্ত দ্রুত ছড়ানো রোগ” বা high contagious disease বলা হয়।
সবচেয়ে দ্রুত ছড়ানো সংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে Measles (হাম)। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২–১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন, যা অত্যন্ত উচ্চ সংক্রমণক্ষমতা নির্দেশ করে। হাম, COVID-19 (করোনা) ও Influenza (ইনফ্লুয়েঞ্জা) ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়।
হাম কিভাবে ছড়ায়?
এই ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি স্থান ত্যাগ করার পরও কিছু সময় পরিবেশে সক্রিয় থাকতে পারে। তাই টিকা না থাকলে অল্প সময়েই বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে এবং ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়।
হামের টিকা কিভাবে তৈরি হয়
হামের টিকা (MMR) অত্যন্ত কার্যকর। টিকা তৈরিতে Measles ভাইরাসকে ল্যাবরেটরিতে দুর্বল (attenuated) করা হয়। এই দুর্বল ভাইরাস শরীরে রোগ সৃষ্টি করতে পারে না, কিন্তু রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা (immune system)-কে সক্রিয় করে তোলে। ফলে শরীর অ্যান্টিবডি তৈরি করে এবং ভবিষ্যতে শক্তিশালী ভাইরাস আক্রমণ করলে তা দ্রুত প্রতিরোধ করতে পারে।
এই পদ্ধতিকে “live attenuated vaccine” বলা হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী সুরক্ষা দেয়। দুই ডোজ নিলে প্রায় ৯৭% পর্যন্ত সুরক্ষা পাওয়া যায়। টিকা না নিলে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়।
বড়দের কি হাম হয়?
বড়দেরও Measles হতে পারে, বিশেষ করে যাদের টিকা নেওয়া হয়নি বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম। বড়রাও MMR টিকা নিতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা ছোটবেলায় টিকা নেয়নি বা সম্পূর্ণ ডোজ নিশ্চিত নয়, তারা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থাতেও টিকা নিতে পারেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষার্থী, বিদেশযাত্রী বা ভিড়ের মধ্যে কাজ করেন—এমন মানুষের জন্য এটি বেশি জরুরি। অনেকে মনে করেন হাম শুধু শিশুদের রোগ—এটি ভুল।
হামের উপসর্গ
হামের প্রধান উপসর্গ হলো—উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি। মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ (Koplik spots)ও দেখা যেতে পারে।
হামের নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। সাধারণত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ভিটামিন A অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।
হামের জটিলতা সবচেয়ে ভয়ংকর জটিলতা হলো মস্তিষ্কে প্রদাহ (Encephalitis)। Measles–এর জটিলতায় যখন মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয়, বিশেষ করে এনসেফালাইটিস বা SSPE দেখা দেয়, তখন ব্রেইন কোষে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাথলজিক্যাল পরিবর্তন দেখা যায়—যেমন নিউরোইনফ্ল্যামেশন (Neuroinflammation), ডিমাইলিনেশন (Demyelination), অ্যাপোপটোসিস (Apoptosis), ব্লাড–ব্রেইন ব্যারিয়ার ডিসরাপশন (Blood–brain barrier disruption) এবং সিন্যাপটিক ডিসফাংশন (Synaptic dysfunction)।
এতে খিঁচুনি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, অস্বাভাবিক আচরণ এবং বাচন সমস্যা দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। পরবর্তীতে আচরণগত সমস্যা, বুদ্ধিবিকাশে বিলম্ব বা অন্যান্য মানসিক ও স্নায়বিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
হামের টিকা: এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের কাহিনি
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হাম (Measles) প্রতিরোধী টিকা নিয়মিত দেওয়া হয়—বাংলাদেশেও এটি শিশুদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রুটিন টিকা। কিন্তু কীভাবে এল এই টিকা?
টিকা আবিষ্কারের চাঞ্চল্যকর ইতিহাস:
হামের টিকা উদ্ভাবনের কৃতিত্ব মূলত জন এফ. এন্ডার্স ও তাঁর সহকর্মীদের। ১৯৫৪ সালে তারা ডেভিড এডমনস্টন নামের এক অসুস্থ শিশুর রক্ত থেকে হাম ভাইরাস আলাদা করেন। এই হাম ভাইরাসটিকেই পরবর্তীতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় দুর্বল করে তৈরি করা হয় ‘এডমনস্টন-বি স্ট্রেইন’ নামের নমুনা, যা পরবর্তী টিকা উদ্ভাবনে ব্যবহার করা হয়।
১৯৬৩ সালে এন্ডার্স ও তাঁর সহকর্মী চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা জিনগতভাবে দুর্বল হাম ভাইরাস (‘এটেনুয়েটেড ভাইরাস এডমনস্টন-বি স্ট্রেইন’) ব্যবহার করে প্রথম সফল টিকা তৈরি করেন। এই দুর্বল ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে কোনো রোগ না ঘটিয়েই এক ধরনের প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করে, যা পরবর্তীতে প্রকৃত (সবল) হাম ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত করে।
পরবর্তীতে হামের টিকাকে আরও উন্নত ও নিরাপদ করে এমএমআর টিকা (হাম-মাম্পস-রুবেলা) আবিষ্কার করা হয়। এন্ডার্স শুধু হামের টিকার জন্যই নয়—পোলিও টিকা আবিষ্কারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। এই আবিষ্কার সত্যিই বিশ্বস্বাস্থ্যের ইতিহাসে এক মাইলফলক। হামের টিকা এখন পর্যন্ত কোটি কোটি শিশুকে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হাত থেকে রক্ষা করেছে—এটাই বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি।
উপসংহার
সুতরাং, হামকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। সময়মতো টিকা গ্রহণই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর প্রতিরোধ। তবে মাস্ক ব্যবহার কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে, কিন্তু এটি টিকার বিকল্প নয়।
ডা. সাঈদ এনাম (ডিএমসি, বিসিএস) সহযোগী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি ইন্টারন্যাশনাল ফেলো, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন।