শুল্কছাড়েও দাম কমেনি ক্যান্সারের ওষুধের

ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন

প্রকাশিতঃ সকাল ১১:৩৮, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩
ছবি: সংগৃহীত।

ছবি: সংগৃহীত।

দেশে প্রতিবছর আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। আকাশচুম্বী চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় ওষুধশিল্পকে স্বাবলম্বী করতে এবং রোগীদের স্বস্তি দিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছর এবং আগের অর্থবছরের বাজেটে ওষুধ তৈরির কাঁচামালে বড় ধরনের করছাড় দিয়েছে সরকার।

নতুন বাজেটে ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধের নতুন ৯টি কাঁচামাল এবং ওষুধ তৈরির মূল উপাদান অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টসসহ (এপিআই) মৌলিক কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য শতাংশ করা হয়েছে। কিন্তু বাজেটের বড় ছাড়ের সুফল এখনো সাধারণ রোগীদের দোরগোড়ায় পৌঁছেনি।

রাজধানীর মিটফোর্ড, শাহবাগ এবং ক্যান্সার হাসপাতাল সংলগ্ন বিভিন্ন ওষুধের দোকান ঘুরে এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জীবন রক্ষাকারী এই ওষুধের বাজারে বাজেটের কোনো দৃশ্যমান প্রভাব পড়েনি। আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে বেশির ভাগ ওষুধ।

ডিজিডিএর প্রাইস কন্ট্রোল কমিটির কার্যক্রম এবং নতুন মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় কর ও শুল্ক কমালেও বাজারে ওষুধের খুচরা মূল্য কমছে না বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, বিপুল ব্যয়ের ক্যান্সার চিকিৎসার বোঝা লাঘবে সরকার প্রতি বাজেটেই ক্যান্সারের ওষুধ ও এর কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ শুল্ক ও কর ছাড় দিচ্ছে। কিন্তু সরকারের এই জনবান্ধব উদ্যোগের সুফল রোগীরা পায় কি না তার সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত নেই।

তদারকির ঘাটতিকে মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি আরো বলেন, শুল্কছাড়ের সুবিধার সঙ্গে ওষুধের চূড়ান্ত খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক যোগসূত্র তৈরি করা হয়নি। শুল্কছাড়ের প্রকৃত সুবিধা সাধারণ রোগীদের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে ডিজিডিএকে প্রতিটি ব্যাচের উৎপাদন খরচ মনিটর করতে হবে।

ক্যান্সারের ভয়াবহতা : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের (আইএআরসি) সাম্প্রতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে এক লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ রোগীর সংখ্যাই বেশি। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বছরে মারা যাচ্ছে এক লাখ ১৬ হাজার ৫৯৮ জন।

ক্যান্সারের এই বিশাল গ্রাফ ও ক্রমবর্ধমান চাহিদাই দেশীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্যান্সারের ওষুধ তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছে। বর্তমানে বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস, ইনসেপ্টা, রেনেটা পিএলসি, হেলথকেয়ারসহ দেশের ১৭ থেকে ১৮টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ক্যান্সারের বিশ্বমানের ওষুধ উৎপাদন করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব দেশীয় প্রতিষ্ঠান ক্যান্সারের ওষুধের মোট চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই পূরণ করছে।

বাজেটে শুল্কছাড়ের চিত্র : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধের নতুন উপকরণ এবং ওষুধ তৈরির মূল উপাদান এপিআইসহ মোট ৭৭টি নতুন মৌলিক কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট তুলে নেওয়া হয়েছে। ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধার তালিকায় নতুন করে আরো ৯টি মৌলিক কাঁচামাল যুক্ত করা হয়েছে। এসব কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য শতাংশ করা হয়েছে।

এর আগে ক্যান্সারের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির ওপর উৎস কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করে অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি এবং যন্ত্রপাতি আমদানিতে বড় ছাড় দিয়েছে।

দেশীয় উৎপাদনে দাম কমছে আমদানির তুলনায় : দেশীয় উৎপাদনকারীদের সক্ষমতা বাড়ার কারণে বিগত কয়েক বছরে আমদানিনির্ভর ক্যান্সার ওষুধের তুলনায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বেশ কিছু ওষুধের দাম কমেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে খুচরা বাজারে কিছু ওষুধের দাম উল্টো বৃদ্ধির চিত্রও দেখা গেছে। জামালপুরের ইনসাফ ফার্মেসির মালিক সোহেল রানা জানান, ক্যান্সার ও তীব্র ব্যথা উপশমে ব্যবহৃত ‘টোরাক্স-১০’ নামক ট্যাবলেটের প্রতি পিসের দাম ১২ টাকা থেকে বেড়ে ২০ টাকা হয়েছে। চিকিৎসা নিতে আসা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা খরচ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।’

বীকন ফার্মাসিউটিক্যালসের অনকোলজি, বায়োটেক ও পেলিয়াটিভ কেয়ার বিভাগের পরিচালক এবং এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম মাহমুদুল হক পল্লব বলেন, ‘দেশে উৎপাদন বাড়ায় ক্যান্সারের ওষুধের দাম আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে কাঁচামালের বিশ্ববাজারের ওঠানামা এবং স্থানীয় গ্যাস-বিদ্যুৎ ও ডলারের বিনিময় হারের কারণে সব ওষুধের দাম একই অনুপাতে কমানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।’

তিনি আরো জানান, ক্যান্সার চিকিৎসার সর্বাধুনিক পদ্ধতি ইমিউনোথেরাপির খরচ আগে প্রতি ডোজ চার লাখ টাকা থাকলেও দেশীয় উদ্যোগে তা দেড় লাখ টাকায় নেমে এসেছে, যা পার্শ্ববর্তী দেশের চেয়েও কম। তবে খরচ অর্ধেক কমলেও দেড় লাখ টাকা পার ডোজ এখনো সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।’

শুল্কছাড়ের পরও কেন কমছে না ওষুধের দাম : ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবার জন্য শাহবাগের একটি ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাজেটে শুল্ক কমার খবর টিভিতে দেখেছি। কিন্তু গত মাসে ক্যান্সারের যে কেমোথেরাপির ফাইল ১২ হাজার টাকায় কিনেছি, আজকেও বিক্রেতা এক টাকা কম রাখেনি। বাজেটের ছাড়ের টাকা আসলে কার পকেটে যাচ্ছে?’

ফার্মেসি মালিকদের দাবি, ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ওষুধের খুচরা মূল্য (এমআরপি) না কমালে তাঁদের পক্ষে কম দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতির (বিসিডিএস) এক কর্মকর্তা জানান, কম্পানিগুলো কারখানায় উৎপাদন খরচ কমলেও বোতলের বা পাতার গায়ে প্রিন্ট করা দাম না কমালে খুচরা বিক্রেতাদের কিছু করার থাকে না।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য মতে, সরকার ক্যান্সারের ওষুধের কাঁচামাল ও ভ্যাট কমালেও খুচরা বাজারে দাম না কমার মূল কারণ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) থেকে এখনো ওষুধের নতুন দাম পুনর্নির্ধারণ বা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। বাজেটে যে ৯টি এইচএস কোডের ওষুধের কাঁচামালের ওপর রেয়াত দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর দাম ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাজেটের শুল্ক মওকুফের সুবিধা সাধারণ রোগীরা কেন পাচ্ছে না—এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ডিজিডিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ‘কাঁচামাল আমদানিতে কর ছাড় দেওয়ার ফলে উৎপাদনকারীদের খরচ কতটা কমেছে এবং সে অনুযায়ী ওষুধের খুচরা মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে শিগগিরই একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক আহবান করা হবে। কোনো কম্পানি সরকারের করছাড়ের সুবিধা নিজেরা পকেটস্থ করে ওষুধের চড়া দাম বজায় রাখলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিশেষজ্ঞদের অভিমত : জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজিডিএর প্রাইস কন্ট্রোল কমিটির কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নতুন কোনো প্রাইস হচ্ছে না। ফলে সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা সাধারণ রোগীরা ভোগ করতে পারছে না। সরকার যে ছাড় দিচ্ছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করে প্রতিটি ওষুধের নতুন এমআরপি পুনর্নির্ধারণ করে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। দেশীয় ক্যান্সার ওষুধ যেখানে সাশ্রয়ী মূল্যে মিলছে, সেখানে চিকিৎসকরা বিদেশি বা আমদানীকৃত অতি উচ্চমূল্যের ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। চিকিৎসকদের জেনেরিক নাম লেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

ওষুধ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এই বিপুল পরিমাণ ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধ দেশে উৎপাদন না করত, সে ক্ষেত্রে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যেত। ক্যান্সার নামের এই মারণব্যাধির হাত থেকে দেশের কোটি দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে বাঁচাতে হলে সরকারের দেওয়া বাজেটের শুল্কছাড়ের কানাকড়ি হিসাবও সাধারণ রোগীর পকেট পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে।

Share This Article

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়