মরুর বুকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল ইসলাম
ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন
সভ্যতার ইতিহাসে কিছু দৃশ্য আছে, যা শুধু ইতিহাস নয়, মানুষের বিবেককেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। পৃথিবীর নানা প্রাচীন সমাজে নারীর অবস্থান ছিল এমনই এক প্রশ্ন। কোথাও তিনি উত্তরাধিকারবঞ্চিত, কোথাও সামাজিক মর্যাদাহীন, কোথাও বা শুধু পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ইচ্ছার সম্প্রসারিত ছায়া। মানবসভ্যতা যখন নিজের শক্তি ও সাম্রাজ্যের অহংকারে মগ্ন, তখনো নারীকে মানুষ হিসেবে তার পূর্ণ মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে সে ছিল বিস্ময়করভাবে কৃপণ।
এই বাস্তবতার ভেতরেই ইসলামের আবির্ভাব হয়। ইসলাম প্রথমেই কোনো রাজনৈতিক স্লোগান দেয়নি, কোনো সামাজিক আন্দোলনের ভাষাও ব্যবহার করেনি। সে মানুষের পরিচয় নতুন করে নির্ধারণ করেছে। বলেছে, মানুষ তার লিঙ্গের কারণে মর্যাদাবান নয়; মর্যাদাবান তার মানবত্বের কারণে। এই একটি ধারণা আরবের মরুভূমিতে যেমন নতুন ছিল, তেমনি মানবসভ্যতার বৃহত্তর ইতিহাসেও ছিল অসাধারণ। পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘নিশ্চয়ই আমি আদমসন্তানকে মর্যাদাবান করেছি।’ (সুরা : ইসরা/বনি ইসরাইল, আয়াত : ৭০)
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে মর্যাদার ভিত্তি নারী কিংবা পুরুষ হওয়া নয়; মানুষ হওয়া। ইসলামের নারী-দর্শনের শিকড় তাই কোনো বিশেষ সুবিধা বা দয়ার দর্শনে নয়, বরং মানবমর্যাদার দর্শনে প্রোথিত। কোরআনের আরেক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী... আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৫)
এই আয়াত ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের আধ্যাত্মিক মর্যাদার এক অনন্য ঘোষণা। মানুষের মূল্যায়ন এখানে লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়, ঈমান, চরিত্র ও আমলের ভিত্তিতে। ইসলাম নারীকে করুণা করেনি; তাকে সম্মান করেছে। এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর পার্থক্য আছে। করুণা আসে শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি থেকে, সম্মান আসে যথামর্যাদার স্বীকৃতি থেকে।
ভাবলে বিস্ময় জাগে, যে সমাজে কন্যাসন্তানের জন্ম অনেকের কাছে অপমানের কারণ ছিল, সেই সমাজেই কোরআন মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, ‘জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা : তাকভির, আয়াত : ৮-৯)
ইতিহাসে অনেক আইন এসেছে, অনেক শাস্তি এসেছে; কিন্তু মানুষের মানসিকতা বদলে দেওয়ার জন্য কখনো কখনো একটি প্রশ্নই যথেষ্ট হয়। ইসলামের সেই প্রশ্ন আরবের বুকে কন্যাশিশুর জন্য নতুন ভোরের সূচনা করেছিল। কন্যার প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু একটি সামাজিক সংস্কার ছিল না; এটি ছিল মূল্যবোধের পুনর্নিমাণ। যে শিশুর জন্ম একসময় লজ্জার কারণ বলে বিবেচিত হতো, ইসলাম তাকে জান্নাতের পথের সহযাত্রীতে পরিণত করল। রাসুলুল্লাহ (সা.) কন্যাসন্তানের যথাযথ লালন-পালনকে পরকালের মুক্তির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইতিহাসের ভাষায় এটি ছিল এক নীরব কিন্তু গভীর বিপ্লব।
মানুষের জীবনে প্রথম আশ্রয় হলো মায়ের কোল। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষায় ‘মা’ শব্দটির সঙ্গে এক ধরনের কোমলতা জড়িয়ে আছে। ইসলাম এই কোমলতাকে শুধু আবেগের বিষয় হিসেবে দেখেনি; একে সামাজিক দর্শনের অংশে পরিণত করেছে। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমার সদ্ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ চতুর্থবার জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (বুখারি ও মুসলিম)
এই হাদিসের ভেতরে শুধু আবেগ নয়, একটি সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি লুকিয়ে আছে। যে জাতি মাকে সম্মান করতে শেখে, সে জাতি তার ভবিষ্যেক সম্মান করতে শেখে। একজন মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না; তিনি একটি প্রজন্ম নির্মাণ করেন। ইতিহাসের অনেক মহান মানুষের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তাঁদের চরিত্রের প্রথম ভিত্তি নির্মিত হয়েছে মায়ের স্নেহ, ত্যাগ ও শিক্ষার মাধ্যমে। জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও ইসলামের অবস্থান ছিল যুগান্তকারী। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন অনেক সমাজ ছিল, যেখানে শিক্ষা ছিল একটি বিশেষ শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার। ইসলাম সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিল। কোরআনের প্রথম আহ্বানই ছিল—‘পড়ো, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ১)
এই আহ্বান কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের উদ্দেশে ছিল না; ছিল সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশে। তাই ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, নারীরা শুধু জ্ঞানের গ্রহীতা ছিলেন না; তাঁরা জ্ঞানের ধারক ও বাহকও ছিলেন। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, গবেষণা ছিল, শিক্ষা ছিল, অবদান ছিল। জ্ঞানের জগত্ কোনো লিঙ্গের একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে ইসলাম কখনো কল্পনা করেনি। ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞানের অঙ্গনে নারীর উপস্থিতি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল না; বরং ছিল স্বাভাবিক বাস্তবতা। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগের দিকে তাকালে দেখা যায়, জ্ঞানচর্চার অঙ্গন নারী-পুরুষ উভয়ের পদচারণায় সমৃদ্ধ ছিল। এখানেই ইসলামের সৌন্দর্য। সে নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী বানাতে চায়নি, আবার পুরুষের অধীনস্থ ছায়াও বানায়নি। সে নারীকে সমাজের সহযাত্রী হিসেবে দেখেছে। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের সহযোগী।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৭১)
এই একটি আয়াত ইসলামী সমাজদর্শনের গভীরতম সত্যগুলোর একটি ধারণ করে। এখানে সম্পর্কের ভাষা আধিপত্যের নয়, সহযোগিতার; প্রতিযোগিতার নয়, অংশীদারত্বের। পারিবারিক জীবন সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিও একই রকম মানবিক। কোরআন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবন ও শিক্ষার মাধ্যমে এই আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম; আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (জামে তিরমিজি)
আবার বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি নারীদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করার এবং তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ মুসলিম)
এই বক্তব্যগুলোকে শুধু পারিবারিক নীতিকথা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো আসলে একটি সভ্যতার নৈতিক মানদণ্ড। কারণ যে সমাজ দুর্বলকে সম্মান করতে পারে না, সে সমাজ প্রকৃত অর্থে সভ্য হতে পারে না।
আজকের পৃথিবীতে নারী অধিকার নিয়ে অসংখ্য আলোচনা হয়। আইন বদলায়, স্লোগান বদলায়, তত্ত্ব বদলায়। কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রয়োজন খুব বেশি বদলায় না। মানুষ সম্মান চায়, নিরাপত্তা চায়, ভালোবাসা চায়, স্বীকৃতি চায়। অতএব, ১৪শ বছরেরও বেশি সময় আগে মরুর বুকে আবির্ভূত, সেই সভ্যতাই আমাদের ভিত্তি, যা নারীকে তার যথাযথ মূল্যায়ন করেছে।