লোহিত সাগরে নতুন বিপদ: হুথি ও আল-শাবাবের আঁতাতে বাড়াচ্ছে শঙ্কা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। || বিএমএফ টেলিভিশন
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী এবং সোমালিয়ার আল-কায়েদাঘেঁষা আল-শাবাবের মধ্যে বাড়তে থাকা যোগাযোগ, অস্ত্র বিক্রি এবং সামরিক প্রশিক্ষণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের বিপদের ঘণ্টা বাজাচ্ছে। দুই পক্ষের এই সখ্যতা কেবল নিজেদের শক্তিই বাড়াচ্ছে না, বরং লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের ওপর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মার্কিন আফ্রিকা কমান্ড সতর্ক করে জানিয়েছে, এই সম্পর্ক আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এতে হর্ন অব আফ্রিকায় আল-শাবাবের হামলা চালানোর ক্ষমতা যেমন বাড়াতে পারে, তেমনি লোহিত সাগর ও পশ্চিম ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক পথগুলোতে হুথির প্রবেশাধিকার আরও সহজ করে তুলতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই হুমকি কেবল সাধারণ অস্ত্র চোরাচালানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুই সশস্ত্র গোষ্ঠী তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, চোরাচালানের রুট এবং উপকূলীয় সুবিধাগুলো একত্রিত করে এডেন উপসাগর জুড়ে নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
সন্ত্রাসবাদ ও গোয়েন্দা বিশ্লেষক দানিয়েলে গারেফালো জানান, দুই পক্ষের এই সম্পর্কের গভীরতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। সোমালিয়ায় ইয়েমেনি অস্ত্রের উপস্থিতিই কেবল তাদের সহযোগিতার প্রমাণ দেয় না; বরং ২০২৪ সাল থেকে সরাসরি যোগাযোগ, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং সোমালি যোদ্ধাদের ইয়েমেনে যাতায়াতের প্রমাণ মিলেছে।
জাতিসংঘের সোমালিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সাবেক প্রধান ম্যাট ব্রাইডেনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আল-শাবাব ও অন্যান্য সোমালি দলের প্রায় ১ হাজার ৫০০ যোদ্ধা ইয়েমেনে হুথিদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। যদিও এর সবাই কেবল আল-শাবাবের সদস্য নন, তবুও এত বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত এই সম্পর্ককে আরও সুসংগঠিত করে তুলেছে।
কৌশলগত জ্ঞান বিনিময় ও প্রযুক্তির হাতবদল
নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারীদের জন্য অস্ত্রের চেয়েও বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সামরিক দক্ষতার আদান-প্রদান। একটি অস্ত্রের চালান আটকে দেওয়া বা জব্দ করা সম্ভব, কিন্তু বিস্ফোরক তৈরি, ড্রোন সাজানো কিংবা অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের মতো কৌশল যোদ্ধাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তা সহজে থামানো যায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, আল-শাবাব একটি ড্রোন বা অস্ত্র কেনার চেয়ে সেটি নিজে নিজে পরিবর্তন, তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণের কৌশল আয়ত্ত করা অনেক বেশি ভয়ংকর। বিশেষ করে আইইডি (ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) তৈরি বা ড্রোন পরিচালনার প্রশিক্ষণ ভবিষ্যতের নিরাপত্তাকে কঠিন করে তুলতে পারে।
এদিকে, আল-শাবাব তাদের বর্তমান প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে সোমালিয়ায় নিজেদের অবস্থান আরও পোক্ত করতে চাইছে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক লেসলি অ্যান ওয়ার্নার জানান, আদর্শগত মিল না থাকলেও আর্থিক সুবিধার কারণেই মূলত এই দুই গোষ্ঠী হাত মেলাচ্ছে।
তার মতে, হুথিদের জন্য এটি অপারেশন পরিচালনার অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম, আর আল-শাবাবের জন্য এটি সামরিক শক্তি বাড়ানোর সুযোগ। এডেন উপসাগর দুই ভিন্ন ভূখণ্ডকে আলাদা করেনি, বরং অবৈধ বাণিজ্যের একটি সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করছে।
জটিল হয়ে উঠছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো— এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইয়েমেন ও সোমালিয়ার মধ্যে অস্ত্র, পণ্য ও মানুষ পারাপারের এই নেটওয়ার্ক বহু পুরনো। তবে এবার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই যোগাযোগকে সামরিক সহযোগিতার একটি স্থায়ী অবকাঠামোতে রূপ দিচ্ছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুথির সামরিক প্রকৌশলীরা সোমালিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের আল-শাবাব আস্তানা জিলিব সফর করেছেন। সেখানে তারা বিস্ফোরক ও ড্রোন প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এছাড়া প্রায় ৪০০ সোমালির জন্য ইয়েমেনে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ইয়েমেন ও সোমালিয়া সংকট নিয়ে কাজ করা সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য এই যৌথ আঁতাত নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। এর ফলে একদিকে যেমন সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে, অন্যদিকে সোমালিয়ায় শান্তি ফেরানোর প্রচেষ্টা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
আদর্শগতভাবে হুথি ও আল-শাবাব ভিন্ন ধারার হলেও নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে তারা এই মতপার্থক্য পাশে সরিয়ে রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাত্ত্বিক অমিল সত্ত্বেও পারস্পরিক সুবিধার এই বাস্তবমুখী সহযোগিতা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে এক দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।