গুণগত শিক্ষার মানোন্নয়নে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস ডিসিদের
ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান উন্নয়নে মাঠ প্রশাসন থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)।
রোববার (৩ মে) অনুষ্ঠিত ডিসি সম্মেলনে শিক্ষা সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় এ আশ্বাস দেন তারা। সম্মেলনে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিদ্যমান নানা সমস্যা, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
ডিসিরা বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এজন্য শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, মাঠ প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সমাজের সকল স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা জানান, শিক্ষা কার্যক্রমের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসন আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
সম্মেলনে প্রাথমিক শিক্ষার দুর্বল ভিত্তির বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক পড়া ও বোঝার দক্ষতায় পিছিয়ে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন ডিসিরা। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কার্যকর প্রশিক্ষণ, পড়া শেখানোর দক্ষতা বৃদ্ধি, নিয়মিত মনিটরিং এবং আনন্দমুখর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
ডিসিরা বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় জিপিএভিত্তিক প্রতিযোগিতা অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছেছে। ‘যেভাবেই হোক ভালো ফল করতে হবে’—এই মানসিকতা শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে এবং প্রকৃত শিক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তারা মনে করেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে ফলাফলকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে দক্ষতা ও বাস্তবমুখী জ্ঞানভিত্তিক করতে হবে। এই বিষয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নুরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষার্থীদের ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল তার ব্যক্তিগত বিষয়। অমুকের ছেলে জিপিএ-৫ পেল, অমুকের মেয়ে গোল্ডেন জিপিএ পেল—এই সামাজিক তুলনা অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করছে।’
তার মতে, ফল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমিত রাখা গেলে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ভারসাম্যহীনতা, শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি এবং পাঠদানের মান নিয়েও আলোচনা হয়। কোথাও শিক্ষক সংকট, আবার কোথাও শিক্ষক বেশি কিন্তু শিক্ষার্থী কম—এ ধরনের বৈষম্য দূর করতে শিক্ষক বণ্টনে সমন্বয় ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান একীভূত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
একইসঙ্গে কলেজ শিক্ষকদের নির্ধারিত সময় পূর্ণাঙ্গ উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা অতিরিক্ত ফলনির্ভর হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং প্রতিষ্ঠান—সবাই জিপিএ অর্জনের পেছনে ছুটছে।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সামনে অনুসরণযোগ্য শিক্ষক ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা না থাকলে নিরাপদ সমাজ গঠন সম্ভব নয়।’
একাধিক ডিসি তাদের অভিজ্ঞতায় জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৭৫–৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীই বাংলা ও ইংরেজিতে দুর্বল। অনেকেই প্রশ্ন বুঝে উত্তর দিতে পারে না।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষকদের কার্যকর প্রশিক্ষণ এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পদ্ধতি উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে, কিছু জেলায় আনন্দমুখর শিক্ষা কার্যক্রমের ইতিবাচক প্রভাবও তুলে ধরা হয়। খেলার মাঠ নির্মাণ ও সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানানো হয়।
সম্মেলনে কারিকুলামে বাস্তবমুখী বিষয় অন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়। ডিজিটাল দক্ষতা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক সচেতনতা ও নৈতিক শিক্ষার মতো বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগের কথা জানানো হয়। এছাড়া প্রতিটি উপজেলায় মাল্টিপারপাস পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ক্লাসরুম মনিটরিং জোরদারের পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শ্রেণিকক্ষে মনিটরিং জোরদারে সিসিটিভি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষায় মিড-ডে মিল, ইউনিফর্ম বিতরণ, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বৃদ্ধির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন।