মানবজাতির আশীর্বাদ মহানবী (সা.)
ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন
হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রসুল। স্বয়ং আল্লাহ তাঁকে রাহমাতুল্লিল আলামিন বলে অভিহিত করেছেন। তিনি যে মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ তা স্বয়ং আল্লাহ চিহ্নিত করেছেন। ক্ষমা, দয়া, ধৈর্য, সহনশীলতা, মহানুভবতা ছিল শেষ পয়গম্বরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য সবাইকে মুগ্ধ করত। বিশ্ব ইতিহাসে এমন অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব দ্বিতীয়টি নেই। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। মহান আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) এমন এক সময় পৃথিবীতে আগমন করেন, যখন চারদিক ছিল অসত্য অসুন্দর ও অকল্যাণের কালো অন্ধকারে ঢাকা।
মহানবী (সা.) জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের অবসানকারী ও মানবতার মুক্তির দিশারি হিসেবে আগমন করেন। ঐতিহাসিক মুরের ভাষায়, ‘মুহাম্মদ যে যুগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাঁকে শুধু সে যুগের একজন মনীষী বলা যাবে না বরং তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী।’ ঐতিহাসিক মুর শুধু নয়, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী অনেক গুণীজন রসুল (সা.)-এর প্রশংসা করেছেন অকৃপণভাবে।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী। সেই অন্ধকার যুগেও তিনি সততার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতেন সবার কাছে। ন্যায়পরায়ণতা, ধৈর্য-সাহসিকতা, ক্ষমা-সহনশীলতা, দয়া-উদারতা, সংযম-মহানুভবতা ইত্যাদি তাঁর চরিত্রের সহজাত বৈশিষ্ট্য বলে বিবেচিত হতো। ছোটবেলা থেকেই মহানবী (সা.) ছিলেন সততায় উদ্ভাসিত। তাঁকে ‘আল আমিন’ বা বিশ্বস্ত বলে ডাকা হতো সেই কিশোর বেলা থেকেই।
ইসলাম প্রচারে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ত্যাগ ও নিষ্ঠা অতুলনীয়। আরবরা ঐতিহ্যগতভাবে বেদুইন জাতি। কথায় কথায় সংঘাত ছিল আরব সমাজের চালচিত্র। রসুল (সা.) শুধু ধর্ম প্রচার করেননি, তিনি আরবের মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার অন্যান্য কৃতিত্বও দেখান। আরবের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে সন্ধি-চুক্তি করে শান্তি স্থাপনে মহানবীর ভূমিকা প্রশংসনীয়। একান্ত বাধ্য বা আক্রান্ত না হলে যুদ্ধ না করা এবং শত্রুপক্ষের নারী-শিশু ও বেসামরিক লোকজনকে হত্যা না করার অসাধারণ যুদ্ধনীতি আজকের একবিংশ শতাব্দীতেও অনুকরণীয়।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব ছিলেন মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের নেতা। কাবা গৃহের খাদেম হিসেবে মক্কা শুধু নয়, আরব ভূখণ্ডে এ পরিবারের মর্যাদা ছিল আকাশছোঁয়া। তারপরও মহান আল্লাহর দীন প্রচারে মহান এ পয়গম্বরকে নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়। নিজের এবং অনুসারীদের নিরাপত্তা রক্ষায় তিনি মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হন। তারপরও মক্কার মুশরিকরা নিশ্চুপ ছিল না।
তারা বারবার মদিনার ওপর হামলা চালিয়েছে। শেষ পর্যন্ত মুসলমানরা মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে মক্কা জয়ের কৃতিত্ব দেখান। রক্তপাতহীন মক্কা বিজয়ের দিনে কুরাইশদের প্রতি তাঁর সাধারণ ক্ষমা বিশ্ব ইতিহাসে অতুলনীয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ক্ষমায় বিস্মিত হয়ে ঐতিহাসিক স্টেনলি লেনপুল লিখেছেন, ‘যে নগরীতে দীর্ঘ ১৫টি বছর তিনি ছিলেন অবর্ণনীয় অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার, তিনি এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা নির্মমভাবে বহিষ্কৃত, সেই শহরে যখন তিনি বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করছিলেন, সেটা ছিল যেমন চমকপ্রদ, তেমনি অকল্পনীয়।’ (স্টেনলি লেনপুল, স্টাডিজ ইন মক্কা)
জর্জ বার্নার্ড শ বলেছেন, ‘আমি সব সময় মুহাম্মদের ধর্মকে উচ্চ মর্যাদা দিয়েছি এর আশ্চর্য জীবনীশক্তির জন্য। এটিই একমাত্র ধর্ম, পরিবর্তনশীল দুনিয়ার সঙ্গে যার খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা আছে বলে আমার মনে হয়। আর এ ধর্ম সর্বযুগেই সমাদৃত হতে পারে। আমি এ বিস্ময়কর লোকটিকে বুঝতে চেষ্টা করেছি এবং আমার মতে, তিনি যিশুখ্রিস্টের বিরোধী তো ননই বরং তাঁকে মানবজাতির ত্রাণকর্তা বলা উচিত। আমার বিশ্বাস, তাঁর মতো একজন মানুষ যদি বর্তমান বিশ্বের এক নায়ক হতেন, তাহলে তিনি এ সমস্যাগুলোর এমন সমাধান দিতে সক্ষম হতেন, যা পৃথিবীতে শান্তি ও সুখ এনে দিত। মুহাম্মদের ধর্মের ব্যাপারে আমি এরূপ ভবিষ্যদ্বাণী করছি যে এটি যেমন বর্তমান ইউরোপে গ্রহণযোগ্য হতে শুরু করেছে, তেমনি আগামী দিনের ইউরোপেও তা গ্রহণযোগ্য হবে।’ (দ্য জেনুইন ইসলাম)
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সব নবী-রসুলের নায়ক আখ্যা দিয়ে মহামতি কার্লাইল ১৮৪০ সালে এডিনবার্গে এক সভায় ঘোষণা করেন, ‘শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যেই নয়, ঈশ্বর প্রেরিত দূত বা নবীদের মতো অসাধারণ ব্যক্তিত্বের মধ্যেও ‘নায়ক’-এর স্থান অধিকার করে রয়েছেন সুদূর আরবের উটচালক নবী মুহাম্মদ।’
♦ লেখক : ইসলামি গবেষক