বিপিসির লোকসান ২০ হাজার কোটি, ভর্তুকি না পেলে তেল আমদানি অনিশ্চিত
ডেস্ক রিপোর্ট। || বিএমএফ টেলিভিশন
মার্চ থেকে জুলাই—এই পাঁচ মাসে বেশি দামে জ্বালানি তেল আমদানি করে কম দামে বিক্রি করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান হয়েছে ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ বিপুল লোকসান গুনতে হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও পাঁচ মাসে জ্বালানি তেল বিক্রিতে সরকারের লোকসান হতে পারে ১১ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম না কমলে চলতি বছর বিপিসির মোট লোকসান ৩২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে বিপিসি সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কমপক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, মার্চ থেকে সরকার কোনো ভর্তুকি দেয়নি। ফলে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান না হলে জ্বালানি তেল আমদানি কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স ট্রেড করপোরেশনের (আইটিএফসি) কাছ থেকে নেওয়া বিলিয়ন ডলারের ঋণের কিস্তি পরিশোধও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার বিপিসির চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তেল আমদানিতে লোকসান ও আর্থিক সংকটের পুরো চিত্র জ্বালানি বিভাগকে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এতে বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৯১ ডলারের বেশি। যুদ্ধ পরিস্থিতির দ্রুত অবসান না হলে বাংলাদেশের সামনে আরও বড় আর্থিক সংকট তৈরি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর থেকেই বিপিসির লোকসান বাড়তে থাকে। সংস্থাটির হিসাবে, মার্চে ২ হাজার ২৪৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, এপ্রিলে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি ৩ লাখ টাকা, মে মাসে ২ হাজার ৬২১ কোটি ২৮ লাখ টাকা, জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং জুলাইয়ে ১ হাজার ১২৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচ মাসে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
এর মধ্যে ১৮ এপ্রিল এমভি ক্যাপ বনি নামে একটি জাহাজে ৩৩ হাজার ৩৭৯ টন ডিজেল আমদানি করা হয়। ওই জাহাজের ডিজেলের বিল পরিশোধ করতে হয়েছে প্রতি লিটার ২৭০ টাকা ৩২ পয়সা দরে। অথচ তখন দেশে ডিজেল বিক্রি হচ্ছিল প্রতি লিটার ১০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি লিটারে ১৭০ টাকার বেশি লোকসান হয়েছে। শুধু ওই একটি জাহাজের ডিজেল আমদানিতেই বিপিসির লোকসান হয়েছে ৬৭২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম না কমলে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারকে গড়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১৭২ টাকা ৫৪ পয়সা, অকটেন ১৪৬ টাকা এবং পেট্রোল ১৪২ টাকায় কিনতে হতে পারে। এ হিসাবে শুধু ডিজেলেই প্রতি লিটারে ৫৭ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হবে। আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। বিষয়টি জ্বালানি বিভাগ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়কে একাধিকবার জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ডিজেল, জেট ফুয়েল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, মেরিন ফুয়েল, এএলসি, মারবান ও এলপিজি মিলিয়ে ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন জ্বালানি কিনতে হবে। এতে ব্যয় হতে পারে ৮ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা। অক্টোবরে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টন জ্বালানি কিনতে প্রয়োজন হবে ৮ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। নভেম্বরে ৭ লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি কিনতে ব্যয় হতে পারে ১১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকার বেশি।
অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর—এই তিন মাসেই জ্বালানি পণ্যের বিল পরিশোধ করতে হবে প্রায় ২৮ হাজার ৮৭৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
বিপিসি জানিয়েছে, কয়েক বছরের মুনাফার অর্থ দিয়ে সংস্থাটি এতদিন ভালোভাবেই চলছিল। বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা জমা ছিল। এর মধ্যে সরকার ১১ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। অবশিষ্ট অর্থ ইস্টার্ন রিফাইনারি-২সহ বিভিন্ন প্রকল্পে রাখা হয়েছিল। তবে চলতি বছর যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই অর্থও শেষ হওয়ার পথে। বর্তমানে বিপিসি অনেক কষ্টে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আগের সরকার বিপিসির কাছ থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যায়। সেই টাকা ফিরিয়ে দিলেও বিপিসি কোনোভাবে চলতে পারবে। তেল আমদানির সক্ষমতা বাড়বে। নতুবা সামনে বড় বিপদ হবে।
তেল আমদানি থেকে সরকারের রাজস্ব
জ্বালানি তেল আমদানি থেকে সরকার শুল্ক ও ভ্যাট বাবদ উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পায়। প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে ফেব্রুয়ারিতে সরকার শুল্ক ও ভ্যাট বাবদ ১৮ টাকা ৩৬ পয়সা পেয়েছে। তেলের দাম বাড়ার কারণে এপ্রিলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতি লিটারে ৩৮ টাকা ৯০ পয়সা এবং জুলাইয়ে ২৯ টাকা ৭৪ পয়সা হারে শুল্ক ও ভ্যাট আদায় করেছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে প্রতি লিটার ডিজেলে আমদানি শুল্ক ও কর বাবদ ৩৮ টাকা ৯০ পয়সা আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে শুল্ক ৮ টাকা ৯৭ পয়সা, ভ্যাট ২৩ টাকা ৭৭ পয়সা, এটিআই ৩ টাকা ১৭ পয়সা এবং এআইটি ২ টাকা ৯৯ পয়সা।
বিপুল লোকসানের মুখে থাকা বিপিসির চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জ্বালানি বিভাগকে জানানো হয়েছে, জ্বালানি তেল আমদানি স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে ২০ হাজার ৫৯ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। বিকল্প হিসেবে মার্চ থেকে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগের হারে শুল্ক-কর নির্ধারণ অথবা আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারে তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপিসির আর্থিক পরিস্থিতির পুরো চিত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করার জন্যও জ্বালানি বিভাগকে অনুরোধ করেছেন বিপিসির চেয়ারম্যান।